
আমি বিদিশা এরশাদ। এ নামটি উচ্চারণ করলেই হয়তো অনেকের চোখে ভেসে ওঠে নানা প্রশ্ন, নানা বিতর্ক, নানা ভুল বোঝাবুঝি। কিন্তু আজ আমি সেসব প্রশ্নের জবাব দিতে বসিনি। আজ আমি বলতে চাই ইতিহাসের সেই কথাটা, যেটা বলা না হলে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টি নামক দলটির আর কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না।
রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সহধর্মিণী হিসেবে যখন আমি জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে পা রাখলাম, তখন আমার হাতে ছিল একটাই অস্ত্র, তারুণ্যের বিশ্বাস আর আধুনিক মানসিকতা। আমি জানতাম, বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন আনতে হলে তরুণদের হাতে ক্ষমতা দিতে হবে। জাতীয় পার্টির ইয়াং সমাজ ছিল আমার ধ্যান, আমার স্বপ্ন, আমার প্রাণ। আমি অফিস করেছি, রাতদিন পরিশ্রম করেছি, তরুণদের সংগঠিত করেছি। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে হয়তো প্রথমবারের মতো একটা তারুণ্যের সংস্কারের হাওয়া এসেছিল। লাঙ্গলের পালে সেই হাওয়া লাগিয়েছিলাম আমি নিজ হাতে।
কিন্তু এ সংস্কারই হয়ে উঠল আমার সবচেয়ে বড় শত্রু। হিংসুকরা দেখল বিদিশা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, তরুণরা তার দিকে তাকিয়ে আছে। এ জনপ্রিয়তা তাদের সহ্য হয়নি। শুরু হলো ষড়যন্ত্রের নোংরা খেলা। এরশাদ সাহেবকে আমার বিরুদ্ধে ভুল বোঝানো হলো, মিথ্যা গল্প ছড়ানো হলো আর তারপর এলো সেই হাস্যকর মোবাইল চুরির মামলা। যে মানুষ লাখ লাখ টাকা দামের মোবাইল উপহার দিতেন, তাকে মোবাইল চুরির অভিযোগে ফাঁসানো হলো। কী নিদারুণ পরিহাস।
আমাকে সংসার ছাড়তে হলো। কেউ দেখেনি সেই রাতগুলোর দীর্ঘশ্বাস, কেউ শোনেনি একজন নারীর নীরব কান্না। মানুষ ভাবে শক্ত থাকা মানেই বেদনা নেই। কিন্তু শক্ত থাকার জন্য যে প্রতিদিন নিজের ভেতরকে হত্যা করতে হয়, সেই কষ্ট কে বোঝে? আমি ভাঙিনি, কিন্তু ভেঙে যেতে না পারার যন্ত্রণা আমাকে প্রতিদিন ক্ষত-বিক্ষত করেছে।
তবু বিচ্ছেদের পরেও এরিকের বাবার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। উনার পছন্দের টাকি মাছের ভর্তা, সবুজ শাক ভাজি নিয়মিত রান্না করে পাঠাতাম। তিনি আমার কাছে অকপটে বলতেন রওশন এরশাদের অবহেলার কথা। জানাতেন ছোট ভাই সেলিম, যাকে সবাই জিএম কাদের বলে চেনে, জোর করে চেয়ারম্যানশিপে সই করাতে চাইছে। ডুকরে কাঁদতাম উনার সেই হাহাকার শুনে। ইচ্ছা হতো ছুটে যাই, সব বাধা ভেঙে। কিন্তু আমাকে বারবার আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। দূর থেকে দেখেছি কীভাবে ক্ষমতার লোভ মানুষকে অন্ধ করে দেয়, কীভাবে রক্তের সম্পর্ক হয়ে যায় ক্ষমতার দাবার ঘুঁটি।
এ পুরো সময়টায় আমি কোথায় ছিলাম? কী করছিলাম? যারা আমাকে সরিয়েছেন, তারা কি একবারও জানতে চেয়েছেন? সিলেটে যখন বন্যায় লাখো মানুষ পানিবন্দি, আমি তখন সীমিত সামর্থ্য নিয়ে একা সেই মানুষগুলোর কাছে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। কোনো ক্যামেরার সামনে নয়, কোনো দলীয় ব্যানারের আড়ালে নয়। করোনা মহামারির সময়ও একই কথা। যখন রাস্তায় বের হওয়া মানে মৃত্যুর ঝুঁকি, তখনো আমি সেই অসহায় মানুষগুলোর পাশে ছিলাম। কোনো তোয়াক্কা না করেই। আর কাদের সাহেব? রওশন এরশাদ? তারা তখন কোথায় ছিলেন? আখের গোছাতেই তারা ব্যস্ত ছিলেন। এটাই পার্থক্য। এটাই আসল রাজনীতি আর নকল রাজনীতির ফারাক।
আমাকে আওয়ামী লীগপন্থি বলে দাগিয়ে দেওয়া হলো, ভারতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা বলে অভিযুক্ত করা হলো। অথচ সত্যটা কী? বাংলাদেশের ৩০ থেকে ৩২টি জেলা সরাসরি ভারতের সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে যুক্ত। এ বাস্তবতা অস্বীকার করে কি রাজনীতি করা যায়? আমি জানতাম কীভাবে এ সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়, কীভাবে বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা সেসব কথা শুনতে চায়নি, তারা শুধু আমাকে সরাতে চেয়েছিল।
এখন একটু ইতিহাসের দিকে তাকানো দরকার। কারণ, ইতিহাসের আয়নায়ই আজকের পতনটা সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায়। এরশাদ সাহেব ১৯৯১ সালে কারাগারে থেকেও রংপুরের পাঁচটি আসনে জয়ী হন। জেলের ভেতর থেকে এ অসম্ভব জয় সম্ভব হয়েছিল। কারণ, উত্তরবঙ্গের মানুষের সঙ্গে তার একটা আত্মার সম্পর্ক ছিল, রাজনীতির সম্পর্ক নয়। সারা দেশে সেই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ১১ থেকে ১২ শতাংশ ভোট পেয়েছিল আর রংপুর বিভাগের অনেক আসনে সেই হার ছিল ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। ১৯৯৬ সালে দলটি সারা দেশে ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, ৩৩টি আসন, তৃতীয় বৃহত্তম দল। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুরে লাঙ্গলের ভোটার ছিল একটা অটুট দেয়ালের মতো। সেটি ছিল জাতীয় পার্টির সোনালি সময়। তারপর একটু একটু করে ভাঙন শুরু হলো। ২০০১ সালে দলীয় বিভক্তিতে মাত্র ১৪টি আসন, ২০০৮ সালে মহাজোটের কাঁধে ভর করে ২৭টি আসন আর ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৩৪টি আসন পেয়ে গায়ে চিরতরে লেগে গেল গৃহপালিত বিরোধী দল তকমাটা।
এ পতনের দায় শুধু একজনের। জি এম কাদেরের। এরশাদ সাহেব চলে যাওয়ার পর থেকে কাদের সাহেব দলটাকে নিজের পারিবারিক সম্পত্তি মনে করে চলেছেন। তার স্ত্রীকে নারী এমপি করার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। সেই খবর বের হতেই দলের ভেতরে বিরাট বিদ্রোহ দেখা দিল। নিজের দলের নেতাকর্মীরাই রাস্তায় নামলেন। এই একটা ঘটনাই বলে দেয় কাদের সাহেব দলকে কী চোখে দেখেন। তিনি দেখেন পারিবারিক ব্যবসা হিসেবে, গণমানুষের সংগঠন হিসেবে নয়।
এ মানুষটির নেতৃত্বে সবচেয়ে বড় যে অবমাননা হয়েছে সেটা দেখতে হলে একবার বনানীর সেই কার্যালয়ের দিকে যেতে হবে। যে অফিস একসময় পুরো বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করত, যে ঠিকানা থেকে একটা জাতির রাজনৈতিক স্বপ্ন পরিচালিত হতো, সেই জাঁকালো অফিসের ভাড়া আজ কাদের সাহেব টানতে পারছেন না। এরশাদ সাহেবের সন্তানতুল্য সেই কার্যালয় আজ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। একটা দলের নেতা দলের প্রধান অফিসের ভাড়া দিতে পারেন না, এর চেয়ে বড় ব্যর্থতার প্রমাণ আর কী লাগে?
আর সবচেয়ে বেদনার কথাটা হলো রংপুর-৩ আসনের কথা। ১৯৮৮ সাল থেকে এ আসন জাতীয় পার্টির। পরপর দুবার এরশাদ সাহেব জেলে থেকেও বিপুল ভোটে বিজয় এনেছেন এ আসন থেকে। সেই পবিত্র রংপুর-৩ আসনে তিনিও নিজে ভরাডুবি খেয়েছেন। এটা পরিসংখ্যানের পরাজয় নয়, এটা বিশ্বাসের পরাজয়। উত্তরবঙ্গের মানুষ নেতৃত্বের ওপর ভরসা হারিয়েছেন।
এ মানুষটাই আবার সম্প্রতি গণভোটে সরাসরি না ভোটের পক্ষ নিয়েছেন, যেখানে সারা জাতি হ্যাঁ ভোটের পক্ষে, তারেক রহমান সাহেবও হ্যাঁ ভোটের পক্ষে আছেন। একা দাঁড়ানোর সাহস প্রশংসনীয়, কিন্তু শুধু সাহস দিয়ে তো নির্বাচন জেতা যায় না। দরকার কৌশল, দরকার জনসংযোগ, দরকার তারুণ্যের শক্তি। এ তিনটির কোনোটিই কাদের সাহেবের হাতে নেই।
জুলাই আন্দোলনের সময় এ নেতৃত্ব কোথায় ছিল? দেশের তরুণরা যখন রাস্তায় রক্ত দিচ্ছিল, কাদের সাহেব ও রওশন এরশাদ ফ্যাসিবাদী সরকারের পাশে থেকেছেন। যে আন্দোলন পরে ইতিহাস হয়েছে, সেই আন্দোলনের বিরুদ্ধে কারা কাজ করেছে, কারা তথ্য সরবরাহ করেছে, কারা রাষ্ট্রযন্ত্রের হয়ে মাঠে কাজ করেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর একদিন ইতিহাস দাবি করবে।
রওশন এরশাদ নামটি আমি উচ্চারণ করতে চাই না বিশেষভাবে, কিন্তু না করলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকে। তিনিও একই পরিণতির অংশীদার। তিনিও সেই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার দোসর ছিলেন। দল নিয়ে যখন সংকট, কর্মীরা যখন দিশেহারা, তখন তিনিও নিজের উত্তরাধিকারের রাজনীতিতে মগ্ন ছিলেন। কাদের সাহেব ও রওশন এরশাদের এ কামড়াকামড়িতে জাতীয় পার্টি আজ কার্যত কয়েক টুকরো হয়ে আছে।
২০২৬ সালের নির্বাচন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাতীয় পার্টি তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভরাডুবি করেছে। এরিকের বাবার হাতে গড়া দল এবার একটি আসনেও জয়লাভ করতে পারেনি। এর জন্য একক দায়ী জিএম কাদের নিজেই। পোষা ভৃত্যের মতো বলবে তারা নাকি মাঠেই নামতে পারেনি, এজন্য ভরাডুবি হয়েছে। কিন্তু তাই বলে শূন্য আসন? ভাবা যায়? উত্তরবঙ্গের ভোটব্যাংক সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
আমার ছেলে এরিক এরশাদ এই লাঙ্গলের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক বহন করছে, যে সম্পর্ক কোনো ষড়যন্ত্র মুছে দিতে পারবে না। আমার বয়স আমার পক্ষে, আমার শিক্ষা আমার পক্ষে, আমার তৈরি করা নেটওয়ার্ক আজও জীবন্ত। জেনারেশন জেডের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে, তাদের ভাষায় কথা বলার সক্ষমতা আছে। ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে আমার যে সংযোগ আছে, কোটি টাকা খরচ করলেও তা রাতারাতি তৈরি হয় না। দলের তৃণমূলের একটা বিশাল অংশ আমাকে চেনে, আমার আন্তরিকতায় বিশ্বাস করে। কিন্তু আমি পদ চাই না। ক্ষমতা চাই না। আমি স্ট্যাম্পে সই করে দিতে রাজি আছি যে কাদের সাহেব আমৃত্যু চেয়ারম্যান থাকবেন। আমার একটাই দাবি, দলকে বাঁচান।
কিন্তু যে মানুষটি অফিসের ভাড়া দিতে পারছেন না, নিজের দলের নেতাকর্মীদের বিদ্রোহ থামাতে পারছেন না, রংপুর-৩-এর মতো ঐতিহাসিক আসন ধরে রাখতে পারছেন না, তিনি কি সত্যিই পারবেন দলকে বাঁচাতে? ২০২৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ভরাডুবির জন্য একমাত্র দায়ী কাদের সাহেবের একগুঁয়েমি ও অক্ষমতা। যেখানে ৫০ থেকে ৬০টি আসনে লড়াই করার সক্ষমতা এই দলের ছিল, সেখানে একটি আসনও পাওয়া যায়নি।
তাই আমি আজ সম্মানের সঙ্গে, ভালোবাসার সঙ্গে কিন্তু স্পষ্ট ভাষায় বলছি—কাদের সাহেব, এই দলটি আপনার চেয়ে বড়। এ লাঙ্গলের ইতিহাস আপনার চেয়ে পুরোনো। কোটি মানুষের আবেগ আপনার একগুঁয়েমির চেয়ে মূল্যবান। আপনার সম্মানিত ভাই এরশাদ সাহেব এই দল গড়েছিলেন তার জীবন দিয়ে। সেই দলকে আর ক্ষতবিক্ষত করবেন না। দ্রুত নাকে খত দিন, মুচলেকা দিয়ে বিদায় হন। লাখ লাখ কর্মী-ভক্ত নিয়ে এই সিনেমার খেলা আর চলবে না। সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করুন। দলটাকে মাঠের মানুষের হাতে ছেড়ে দিন। এটাই এই মুহূর্তে আপনার সবচেয়ে বড় দেশপ্রেম, সবচেয়ে বড় দলপ্রেম।
উত্তরবঙ্গের রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধার সেই লাঙ্গলপাগল মানুষগুলো এখনো আছেন। তারা হতাশ, বিভ্রান্ত, রাগান্বিত, কিন্তু চলে যাননি। তারা অপেক্ষা করছেন কেউ একজন আসুক, দলটাকে আবার এক করুক। আমি সেই মানুষ হতে চাই। আমার ভাঙা স্বপ্নের টুকরোগুলো জড়ো করে আবার দাঁড়াতে চাই। লাঙ্গলের পালে আবার সেই পুরোনো হাওয়া লাগাতে চাই।
ইতিহাস আমাকে কীভাবে মনে রাখবে জানি না। হয়তো কেউ ভুল বুঝবে, হয়তো কেউ মনে রাখবে একজন সংগ্রামী নারী হিসেবে। কিন্তু নিজের কাছে আমি জানি, আমি চেষ্টা করেছি, শেষ পর্যন্ত করে যাব। আমি ভাঙিনি।
লাঙ্গলের হাল ধরার মানুষ প্রস্তুত আছে।
লেখক: রাজনীতিক ও মানবাধিকারী কর্মী