
দেশের প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদনে প্রবেশপথ ও পাস ইস্যু ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ না করেই বিভিন্ন ব্যক্তি সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু নন-ক্যাডার কর্মকর্তাও এমন ব্যক্তিদের প্রবেশপাস দিয়েছেন, যাদের জন্য পাস ইস্যুর আইনগত এখতিয়ার তাদের নেই। আবার সচিবালয়ের কয়েকটি প্রবেশপথে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধেও নিয়ম না মেনে দর্শনার্থীদের ঢুকতে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পাস ইস্যুতেই অনিয়মের তথ্য
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক মাস ধরে সচিবালয়ের প্রবেশব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে একাধিক অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার রাকিবুল হাসান ২৭ সেপ্টেম্বর দুটি প্রবেশপাস ইস্যু করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হলেও তার পাস ইস্যু করার এখতিয়ার নেই বলে দাবি করা হয়েছে।
একইভাবে স্থানীয় সরকার বিভাগের সিস্টেম অ্যানালিস্ট মো. শফিকুল ইসলাম ২৮ সেপ্টেম্বর প্রবেশপাস ইস্যু করেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, তারও এ ধরনের পাস দেওয়ার আইনগত ক্ষমতা নেই।
আরও একটি ঘটনায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিবের নামে পাস ইস্যুর তথ্য উঠে এসেছে। অথচ বর্তমান মন্ত্রিসভায় কোনো উপমন্ত্রী না থাকলেও ২৭ সেপ্টেম্বর ইস্যু করা ওই পাসের নিচে ‘উপমন্ত্রীর পিএস’ পদবি লেখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব তথ্য যাচাই করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব মো. আব্দুস সাত্তার উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে ২০ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ইস্যু করা সব ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) সংগ্রহ করা হয়েছে। একই সময় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে ইস্যু করা প্রবেশপাসের ওটিপিও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
এমপির সঙ্গে একাধিক ব্যক্তির প্রবেশ, পুলিশের ভূমিকাও প্রশ্নে
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সংসদ-সদস্যদের সচিবালয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, কোনো কোনো সংসদ-সদস্য ও তার একান্ত সচিবের নামে পাস থাকলেও তারা সচিবালয়ে প্রবেশের সময় গাড়িতে ছয়-সাতজন নেতাকর্মীকে নিয়ে ঢুকছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সচিবালয়ে প্রবেশের পর গাড়িটি বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে একই গাড়িতে আবার লোকজন নিয়ে প্রবেশের অভিযোগও রয়েছে। দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যরা বিষয়টি যাচাই করতে চাইলে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনাও ঘটছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সচিবালয়ের বিভিন্ন ভবনের লিফট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নিয়ম না মানার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কেউ কেউ অপেক্ষমাণ ব্যক্তিদের সারি উপেক্ষা করে জোর করে লিফটে ওঠেন। এতে আগে থেকে অপেক্ষায় থাকা অনেকে লিফটে ওঠার সুযোগ পান না।
সচিবালয়ে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কিছু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে প্রবেশপাস বিক্রির অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সরকারের সময়ই কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এ ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে পাস নিয়ে সচিবালয়ে প্রবেশের অভিযোগ করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত গেটেও বৈষম্যের অভিযোগ
সচিবালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থার আরেকটি দিক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে গোয়েন্দা প্রতিবেদন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের বিপরীত দিকে সাংবাদিকদের সুবিধার্থে একটি প্রবেশপথ রাখা হলেও সেখানে সাংবাদিকদের নিয়মিত প্রবেশের সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বয়স্ক ও অসুস্থ সাংবাদিকদেরও বৃষ্টির মধ্যে মূল গেট ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয়। অন্যদিকে সচিবালয়ে বিভিন্ন কাজে আসা দালালদের অনেকে কোনো পাস ছাড়াই ওই প্রবেশপথ ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু ছাত্রনেতাকেও পাস ছাড়াই সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের সহায়তায় তারা অবাধে প্রবেশ করছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সচিবালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সক্রিয় হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিক দফায় বৈঠক হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত থাকার কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর পুনরাবৃত্তি যাতে না হয়, সে জন্য কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের উপকমিশনার মোহাম্মদ মাহমুদুল কবীরও নিরাপত্তাব্যবস্থার সমস্যাগুলো স্বরাষ্ট্র সচিবকে জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন। তার মতে, এ বিষয়ে কিছু পরামর্শ ও কাজের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নিচে মানুষের ভিড়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মানুষের সঙ্গে দূরত্ব রাখতে চান না। অনেক সময় তিনি মানুষকে কাছে ডেকে কথা বলেন, আবার কখনো কথা না বলেই চলে যান। এটি তার নিজস্ব ইচ্ছা ও এখতিয়ারের বিষয় বলে জানান তিনি।