
বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য আরও স্থিতিশীল, সহজ ও নির্ভরযোগ্য গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে তাঁর সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং বাংলাদেশের বার্তা স্পষ্ট—দেশটি ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত।
শুক্রবার স্থানীয় সময় সকালে নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে জেপি মর্গানের সদর দপ্তর ২৭০ পার্ক অ্যাভিনিউয়ে ওয়াল স্ট্রিটের ব্যবসায়ী নেতা ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এক প্রাতরাশ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফরের মধ্যেই এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বিনিয়োগের পরিবেশ সম্পর্কে নিজের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য আস্থা, পূর্বানুমেয়তা এবং প্রবৃদ্ধির উপযোগী পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে তিনি এখানে এসেছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা যেমন নিজেদের প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগের স্বার্থ দেখেন, তেমনি তিনি দেশের মানুষের স্বার্থে কাজ করেন। দায়িত্ব আলাদা হলেও উভয়ের লক্ষ্য সাফল্য নিশ্চিত করা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে বৈশ্বিক ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশের সম্ভাবনাগুলো সরাসরি বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরতে চান।
বাংলাদেশের বড় ও তরুণ জনগোষ্ঠী, ক্রমবর্ধমান বাজার এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানকে বিনিয়োগের অন্যতম সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তৈরি পোশাক ও উৎপাদন খাতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হলেও এর বাইরেও দেশটিতে বিনিয়োগের বড় সুযোগ রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
জ্বালানি, অবকাঠামো, লজিস্টিকস, প্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, জলবায়ু অর্থায়ন, উৎপাদন, কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবাকে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ খাত হিসেবে তুলে ধরেন তারেক রহমান। ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদন, বিনিয়োগ ও সেবা খাতের একটি কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যও তুলে ধরেন তিনি।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সহজ করা, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা বাড়ানো, বিধিবিধান সরল করা, কর ও ভ্যাট প্রশাসনের উন্নয়ন, মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার কাজ করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার পাশাপাশি জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে নতুন অংশীদারত্ব এবং চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ আরও শক্তিশালী করতে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের প্রথম সার্বভৌম বন্ড ইস্যুতে জেপি মর্গানের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তাঁর মতে, এ উদ্যোগ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের জন্য নতুন একটি রেফারেন্স তৈরি করেছে এবং দেশের পুঁজিবাজারকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশের নীতির পাশাপাশি বাস্তবে তার প্রয়োগ কীভাবে হচ্ছে, সেটিও বিবেচনা করেন বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। বিনিয়োগের নিরাপত্তা, বিধিবিধানের পূর্বানুমেয়তা, মূলধন স্থানান্তরের সুবিধা এবং মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ—এসব বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের যৌক্তিক উদ্বেগ রয়েছে বলেও জানান তিনি। সরকারের দায়িত্ব কার্যকর নীতির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করা এবং স্বল্পমেয়াদি লেনদেনের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলা বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে এমন একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে চায় সরকার, যেখান থেকে বিনিয়োগকারীরা বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন।
বৈঠকে বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের যোগাযোগ ও সমন্বয়ের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
সবশেষে তিনি সরকারের লক্ষ্য হিসেবে আরও বিনিয়োগ, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করার কথা তুলে ধরেন। বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁদের সঙ্গে কাজ করা, মতামত শোনা এবং সম্ভাব্য বাধা দূর করতে সরকার প্রস্তুত।