
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টানা দেড় দশকের শাসনামলে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম এবং অমানবিক নিপীড়ন চালিয়ে সারা দেশে এক ভয়াবহ আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তার মতে, ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের নেতাকর্মী ও সমালোচকদের ওপর পাশবিক নির্যাতন ও গুম-খুনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের বাক্স্বাধীনতা পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার সংসদ সদস্যদের সাথে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) মহাসচিব অ্যান্ডা ফিলিপের এক সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে সভাপতির বক্তব্যে স্পিকার এসব তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এ সময় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে স্পিকার উল্লেখ করেন, আওয়ামী সরকারের দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনে বিরোধীপক্ষের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দিতে ‘আয়নাঘর’-এর মতো গোপন নির্যাতন সেল প্রতিষ্ঠা, বিচারহীনভাবে হত্যা ও গুমের পাশাপাশি ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার করা হয়েছে। এই সব চরম পন্থার মাধ্যমে পুরো রাষ্ট্রজুড়ে ভয়াবহ দমনপীড়নের আবহ সৃষ্টি করা হয়েছিল বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
এই সাক্ষাৎকালে উপস্থিত আক্রান্ত সংসদ সদস্যরাও তাদের তিক্ত ও মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা আইপিইউ মহাসচিবের কাছে তুলে ধরেন। সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি তার ভাই সাজেদুল ইসলামের দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকার বিষয়টি জানান। একইভাবে নিজেরা ‘আয়নাঘরে’ বন্দি থাকা অবস্থায় সহ্য করা অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিবরণ দেন সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম (ব্যারিস্টার আরমান) এবং সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী।
অন্যদিকে, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল স্বামী ইলিয়াস আলীকে বলপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা স্মরণ করেন সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা। তিনি বলেন, মূলত ইলিয়াস আলীকে গুম করার মধ্য দিয়েই দেশের মানুষের কাছে এই শব্দটির পরিচিতি ঘটেছিল। তৎকালীন শাসকদল নিজেদের মসনদ দীর্ঘস্থায়ী করতেই এই অপকর্ম করেছিল বলে অভিযোগ তুলে তিনি এসব বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের বিষয়ে দৃঢ় আশাবাদ প্রকাশ করেন।
বিবরণ শুনে আইপিইউ মহাসচিব অ্যান্ডা ফিলিপ বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া মানবতাবিরোধী এসব গুম, হত্যা ও নির্যাতনকে অত্যন্ত জঘন্য এবং অমানবিক বলে আখ্যা দেন। তিনি নিজের জন্মভূমি রোমানিয়ায় স্বৈরশাসক নিকোলায়ে চসেস্কুর আমলের নারকীয় শাসনের সাথে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ক্রিয়াকলাপের গভীর সাদৃশ্যের কথা উল্লেখ করেন। একইসাথে, চলমান বাংলাদেশ সফর শেষে ঢাকায় পরিচালিত এই গুম, হত্যা ও বর্বরতার চিত্র তুলে ধরে আইপিইউর গভর্নিং বডির কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।