
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে পারমাণবিক শক্তির নিরাপদ, সুরক্ষিত ও শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে আয়োজিত ‘অ্যাটমিক টেকনোলজিস লাইসেন্সড ফর অ্যাপ্লিকেশন্স অব সি (এটলাস) মন্ত্রীপর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ২০২৬’-এ বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ গুরুত্বারোপ করেন।
ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত এটলাসের প্রথম মন্ত্রীপর্যায়ের আয়োজনে বক্তব্য দেন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী বলেন, পারমাণবিক শক্তিকে ঘিরে বৈশ্বিক আলোচনা এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ দায়িত্বশীলতা ও দৃঢ় অঙ্গীকারের সঙ্গে কাজ করছে। বিশেষ করে সামুদ্রিক খাতে উন্নত পারমাণবিক প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহার বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, জলবায়ু সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ এবং ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার কারণে বিশ্ব বর্তমানে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারমাণবিক শক্তির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, উন্নত পারমাণবিক প্রযুক্তি এবং স্মল মডিউলার রিয়্যাক্টর (এসএমআর) ভবিষ্যতের জ্বালানি চাহিদা পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কম-কার্বন বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে এসব প্রযুক্তি দারিদ্র্য কমানো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।
প্যারিস চুক্তির আওতায় প্রথম গ্লোবাল স্টকটেকের ফলাফলে পারমাণবিক শক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিকে বাংলাদেশ স্বাগত জানায় বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক পারমাণবিক সক্ষমতা তিনগুণ করার উদ্যোগের প্রতিও বাংলাদেশের সমর্থনের কথা তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ এবং সীমিত নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের দেশ হওয়ায় বাংলাদেশকে একসঙ্গে বাড়তে থাকা জ্বালানি চাহিদা মেটানো, জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এ কারণে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ জরুরি।
দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচির অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-১-এর ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপের মাধ্যমে বাংলাদেশ বৈশ্বিক পারমাণবিক শক্তি পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর বাংলাদেশের পরিচ্ছন্ন ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানির পথে ঐতিহাসিক অগ্রযাত্রার প্রতীক।
তবে পারমাণবিক শক্তির সম্ভাবনার পাশাপাশি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা সম্পর্কেও বাংলাদেশ সচেতন বলে জানান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী। বিশেষ করে উদ্ভাবনী রিয়্যাক্টর প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও সেফগার্ড নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ উন্নত স্মল মডিউলার রিয়্যাক্টর প্রযুক্তির সময়োপযোগী ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানান তিনি। প্রযুক্তি, নীতিমালা, নিয়ন্ত্রক কাঠামো, নিরাপত্তা এবং সক্ষমতা উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, এটলাস একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। সামুদ্রিক ক্ষেত্রে পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, উদ্যোক্তা ও অন্যান্য অংশীজনকে একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করছে এ উদ্যোগ। এর ফলে বেসামরিক পারমাণবিক সামুদ্রিক শিল্পের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পারমাণবিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক সেফগার্ডের সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে বেসামরিক পারমাণবিক সামুদ্রিক শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরিতে আইএইএর এটলাস উদ্যোগের সঙ্গে ধারাবাহিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আগ্রহের কথাও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জ্ঞান ও প্রযুক্তি বিনিময় এবং দায়িত্বশীলভাবে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।
উল্লেখ্য, ‘অ্যাটমিক টেকনোলজিস লাইসেন্সড ফর অ্যাপ্লিকেশন্স অব সি (এটলাস) মন্ত্রী পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ২০২৬’-এ বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৯টি দেশ অংশ নিয়েছে।