
আধুনিক জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে অনেক নবজাতক প্রয়োজনীয় মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, এ প্রবণতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক মানসিক বিকাশের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়।
শনিবার (১ আগস্ট) রাজধানীর ন্যাশনাল বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান আয়োজিত বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল— ‘জীবনের সূচনায় মাতৃদুগ্ধ পান : টেকসই উদ্যোগ করি বেগবান’।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, অতীতে পরিবারে শিশুর লালন-পালন এবং মাতৃদুগ্ধ পান নিশ্চিত করার বিষয়ে যে সচেতনতা ছিল, জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে তা কমে এসেছে। জন্মের পরপরই নবজাতককে মায়ের কাছ থেকে আলাদা রাখা, কর্মব্যস্ততা এবং আধুনিক জীবনধারার কারণে অনেক মা প্রয়োজনীয় সময় শিশুকে মাতৃদুগ্ধ পান করাতে পারছেন না।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে নবজাতকের জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যেই শালদুধ পান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, মায়ের দুধ শিশুর জন্য সবচেয়ে উপযোগী ও প্রাকৃতিক খাদ্য। এটি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে মায়ের স্নেহ, স্পর্শ ও মাতৃদুগ্ধ শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের অন্যতম ভিত্তি। পরিবারে অশান্তি, অবহেলা কিংবা দীর্ঘ সময় শিশুকে মায়ের কাছ থেকে দূরে রাখার নেতিবাচক প্রভাব তার আচরণ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়ে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সাম্প্রতিক হাম (মিজলস) পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, অপুষ্টির কারণে অনেক শিশু সংক্রমণের বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। মাতৃদুগ্ধ পান নিশ্চিত করা গেলে তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে এবং সংক্রামক রোগ মোকাবিলার সক্ষমতাও বাড়বে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ফাস্টফুড গ্রহণ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং সুষম খাদ্যের অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। শিশুর খাদ্য হিসেবে মায়ের দুধের পরিবর্তে বাজারজাত বিকল্প খাদ্যের ওপর অতিনির্ভরশীলতা কমানোরও আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালন শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সারা বছর জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। এ জন্য জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, সিভিল সার্জন, জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনাও দেন তিনি। একই সঙ্গে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে বলেন, সুস্থ, সক্ষম ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে মাতৃদুগ্ধ পান নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, মাতৃদুগ্ধ পান করানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের তুলনায় ইতিবাচক অবস্থানে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যগত সুফল নিশ্চিত করতে এখনো সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, নিয়মিত ও সঠিকভাবে মাতৃদুগ্ধ পান করালে মায়েদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে এবং ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে। তাই মাতৃদুগ্ধের গুরুত্ব সম্পর্কে পরিবার, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং গণমাধ্যমকে একযোগে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার, পরিবার পরিকল্পনার মহাপরিচালক ডা. জিন্নাত রেহানা এবং জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইউনূস আলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।