
চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এল নিনো শক্তিশালী রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা ও তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়তে পারে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হতে পারে বাংলাদেশে, যেখানে কৃষি, পানিসম্পদ ও খাদ্যনিরাপত্তার বড় অংশ এখনো মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সর্বশেষ মৌসুমি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতি দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হতে পারে, যা একটি শক্তিশালী এল নিনোর ইঙ্গিত। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, অতিবৃষ্টি ও তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়া আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো সম্ভাব্য দুর্বল বর্ষা। ইতোমধ্যে দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মাটির আর্দ্রতা কমে যাওয়া, পুকুর ও খালের পানি হ্রাস এবং সেচের ওপর নির্ভরতা বাড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাত কম হলে আমনসহ মৌসুমি ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, এল নিনোর প্রভাব বাংলাদেশে সব সময় সরাসরি দৃশ্যমান না হলেও এর জলবায়ুগত অভিঘাত অত্যন্ত বাস্তব। তার মতে, দেশের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে কৃষি, পানিসম্পদ, জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যবাজারে।
গবেষণায়ও একই ধরনের সতর্কতা উঠে এসেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বরেন্দ্র অঞ্চলে তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব ও তীব্রতা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের ওয়াগেনিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে এল নিনোর বছরগুলোতে তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাত ও বেশি তাপমাত্রার প্রবণতা পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খরা দীর্ঘায়িত হলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আরও নিচে নেমে যেতে পারে। এতে সেচ ব্যয় বাড়বে, পানির সংকট তীব্র হবে এবং কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি নদীর প্রবাহ কমে গেলে দূষণের মাত্রা বেড়ে মাছের উৎপাদন ও জলজ জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সাম্প্রতিক এক মাঠপর্যায়ের মূল্যায়নে উত্তরাঞ্চলে খরা ও তাপপ্রবাহের কারণে শিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি কমে যাওয়া, নিরাপদ পানির সংকট বৃদ্ধি এবং অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ার তথ্যও উঠে এসেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সার সরবরাহে অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক খাদ্যবাজারের চাপ যুক্ত হলে দেশের খাদ্যমূল্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্ট সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা মোকাবিলায় তুলনামূলক প্রস্তুতি থাকলেও খরা ও তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এখনো সীমিত। তাই সম্ভাব্য এল নিনোর প্রভাব মোকাবিলায় কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও খাদ্যনিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।