
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় নিয়ে সৌদি আরবের সুরক্ষায় বিশাল সামরিক বহর পাঠিয়েছে পাকিস্তান। দুই দেশের মধ্যে অতীতে হওয়া একটি গোপন পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় ইতোমধ্যে সৌদির মাটিতে ৮ হাজার সেনা সদস্য, এক স্কোয়াড্রন অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এবং একটি শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করেছে ইসলামাবাদ। ইরান ও সৌদির মধ্যকার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সম্পর্কে রিয়াদের ইতিবাচক মধ্যস্থতার পরও পাকিস্তানের এই বড় ধরনের সামরিক সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে বেশ সাড়া ফেলেছে।
রিয়াদের সঙ্গে ইসলামাবাদের হওয়া এই বিশেষ প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে এত বড় সামরিক সরঞ্জাম ও জনবল মোতায়েনের সংবেদনশীল তথ্যটি এবারই প্রথম প্রকাশ্যে এল। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনজন শীর্ষস্থানীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং দুটি নির্ভরযোগ্য সরকারি সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো রিয়াদ ও ইসলামাবাদের এই সামরিক আদান-প্রদানকে একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং ‘যুদ্ধ-প্রস্তুত বাহিনী’ (Combat-Ready Force) হিসেবে বর্ণনা করেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো—সৌদি আরব যদি ভবিষ্যতে আবারও কোনো বড় ধরনের বহিঃশত্রুর হামলার শিকার হয়, তবে দেশটির সামরিক বাহিনীকে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে সহায়তা করা। অবশ্য স্পর্শকাতর এই বিষয়টির ওপর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সৌদির সরকারি গণমাধ্যম শাখার সাথে যোগাযোগ করা হলে কোনো পক্ষই মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
এর আগে ২০২৫ সালে স্বাক্ষরিত হওয়া এই কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তির সব ধরনের শর্তাবলি অত্যন্ত গোপন রাখা হয়েছিল। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের সময় উভয় পক্ষ থেকে শুধু এতটুকুই জানানো হয়েছিল যে, কোনো এক পক্ষ যদি বাইরের দেশ দ্বারা আক্রান্ত হয়, তবে পাকিস্তান ও সৌদি একে অপরের প্রতিরক্ষায় সামরিক সহায়তা দিতে আইনিভাবে বাধ্য থাকবে।
প্রতিরক্ষা চুক্তির গভীরতা সম্পর্কে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এর আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরব মূলত পাকিস্তানের পারমাণবিক সুরক্ষার (নিউক্লিয়ার আমব্রেলা) অধীনে চলে এসেছে।
বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই মিশনের অংশ হিসেবে পাকিস্তান প্রায় ১৬টি যুদ্ধবিমানের একটি পূর্ণাঙ্গ স্কোয়াড্রন পাঠিয়েছে সৌদিতে, যার সিংহভাগই চীনের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ (JF-17 Block 3) ফাইটার জেট। এগুলো গত এপ্রিলের শুরুর দিকে সৌদির বিমানঘাঁটিতে পৌঁছায়। এছাড়া দুজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি দুই স্কোয়াড্রন অত্যাধুনিক ড্রোনও সৌদিতে পাঠিয়েছে পাকিস্তান।
প্রতিবেদনের সবগুলো সূত্রই একমত হয়েছে যে, এই সামরিক মোতায়েনের অধীনে বর্তমানে পাকিস্তানের প্রায় আট হাজার সশস্ত্র সেনা সদস্য সৌদিতে অবস্থান করছেন এবং রিয়াদের প্রয়োজনে আরও অধিকতর সেনা পাঠাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ইসলামাবাদ। এর বাইরে সৌদি আকাশসীমা নিরাপদ করতে চীনের তৈরি একটি ‘এইচকিউ-৯’ (HQ-9) আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও সেখানে বসানো হয়েছে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই সামগ্রিক যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামগুলো পরিচালনা করছেন পাকিস্তানি সেনাকর্মীরাই, তবে এর পেছনের যাবতীয় বিশাল লজিস্টিক ও অর্থনৈতিক খরচ বহন করছে সৌদি আরব সরকার।