
দেশে এইচআইভি সংক্রমণের চিত্র ক্রমশ জটিল হচ্ছে, অথচ এখনো ৪১টি জেলায় রোগটি শনাক্ত করার কোনো ব্যবস্থা নেই। মাত্র ২৩টি জেলায় পরীক্ষার সুযোগ থাকায় বিশাল এক জনগোষ্ঠী রোগ নির্ণয়ের বাইরে থেকে যাচ্ছেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করছে।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাজধানীর বিএমএ ভবনে আয়োজিত এক কর্মশালায় উঠে এসেছে এই ভীতিকর তথ্য। বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ) এবং এইডস হেলথকেয়ার ফাউন্ডেশন (এএইচএফ) যৌথভাবে এই কর্মশালার আয়োজন করে।
সংক্রমণের পরিসংখ্যান ও মৃত্যু
কর্মশালায় দেওয়া তথ্যমতে, ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম এইচআইভি রোগী পাওয়া যায়। এরপর দীর্ঘ সময় সংক্রমণের হার স্থিতিশীল থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ২০২৫ সালে নতুন করে ১ হাজার ৮৯১ জন আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটের বাসিন্দা। ২০০০ সালে প্রথম এই রোগে মৃত্যু হলেও ২০২৫ সালেই প্রাণ হারিয়েছেন ২৫৪ জন।
ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী ও সংক্রমণের উদ্বেগজনক হার
সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরুষ সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার। ২০১৭ সালে এই হার ছিল মাত্র ০.৭ শতাংশ, যা বর্তমানে লাফিয়ে ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এছাড়াও আক্রান্তদের মধ্যে ১৪ শতাংশ পুরুষ যৌনকর্মী, ১২ শতাংশ প্রবাসী এবং ১১ শতাংশ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সীদের মধ্যে সংক্রমণের হার সর্বোচ্চ (৬২.৬১ শতাংশ)।
চিকিৎসা ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা
অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক এবং ভাইরাস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, "ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সামাজিকভাবে আক্রমণ বা স্টিগমা করা হলে তারা চিকিৎসা থেকে দূরে সরে যায়। এতে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি আরও বাড়ে। স্টিগমা ও বৈষম্য মানুষকে আন্ডারগ্রাউন্ডে ঠেলে দেয়। ফলে তারা চিকিৎসা নিতে ভয় পায়।"
তিনি আরও আশ্বস্ত করেন যে, সঠিক চিকিৎসায় এইচআইভি এখন ডায়াবেটিসের মতোই নিয়ন্ত্রণযোগ্য। এমনকি বছরে একবার ইনজেকশন নিয়েও সুস্থ থাকা সম্ভব। ১৯৮৪ সালে শনাক্ত হওয়া রোগীও বর্তমানে বেঁচে আছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শনাক্ত ও চিকিৎসার আওতা
এএইচএফ-এর কান্ট্রি ম্যানেজার আক্তার জাহান শিল্পী জানান, দেশে আনুমানিক ১৭ হাজার ৪৮০ জন এইচআইভি আক্রান্ত থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হলেও এখন পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছেন ১৪ হাজার ৩১৩ জন। শনাক্তকৃতদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ বা ৮ হাজার ৫৭৫ জন চিকিৎসার আওতায় এসেছেন।
উত্তরণের পথ ও সুপারিশ
কর্মশালায় বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু জরুরি সুপারিশ তুলে ধরেন:
পরীক্ষার আওতা বৃদ্ধি: দেশের সব জেলায় দ্রুত এইচআইভি পরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা: বিদেশফেরত কর্মীদের জন্য এইচআইভি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
বৈষম্য দূরীকরণ: অসুস্থতার কারণে চাকরি থেকে ছাঁটাই বা মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা।
সচেতনতা: সামাজিক কুসংস্কার দূর করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসার প্রতি আগ্রহী করে তোলা।
সংগঠনের সভাপতি প্রতীক ইজাজের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভর সঞ্চালনায় কর্মশালায় আরও বক্তব্য রাখেন 'কালবেলা'র স্বাস্থ্য সম্পাদক রাশেদ রাব্বি। তিনি সতর্ক করে বলেন, সমকামী জনগোষ্ঠীর পর প্রবাসী শ্রমিকরাই বর্তমানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন।