
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নেওয়া বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ বাতিল করেছে নতুন সংসদ। এর ফলে অনেক সংস্কারই এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে, যা বিরোধী দলগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
২০২৪ সালের ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের পর সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর দায়বদ্ধতা বাড়াতে যেসব সংস্কার আনা হয়েছিল, তার বেশ কয়েকটি বাতিল বা প্রত্যাহার করে নিয়েছে বাংলাদেশের বর্তমান সংসদ। এতে জনমনে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর অর্জিত গণতান্ত্রিক অগ্রগতি থেকে দেশটি কি তবে পিছিয়ে যাচ্ছে?
গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিয়ন্ত্রিত সংসদ সম্প্রতি ১৩৩টি অধ্যাদেশের একটি প্যাকেজ পর্যালোচনা করেছে। এর মধ্যে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারিকৃত বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাব ছিল, যা হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্র সংস্কারে নেওয়া হয়েছিল।
মানবাধিকার, বিচার বিভাগীয় তদারকি, দুর্নীতি দমন এবং পুলিশি ব্যবস্থা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপসহ অন্তত ২৩টি আইন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদীয় অনুমোদন পেতে ব্যর্থ হওয়ায় বাতিল হয়েছে অথবা সেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। যদিও অধিকাংশ অধ্যাদেশই অনুমোদিত হয়েছে, তবে যেগুলো বাতিল হয়েছে সেগুলোকে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ও জবাবদিহিতাহীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজানোর প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ এবং বিশ্লেষকরা একে অভ্যুত্থান-পরবর্তী গণতান্ত্রিক সুরক্ষাকবচ থেকে বিচ্যুতি হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি তদারকি ব্যবস্থা দুর্বল করে ক্ষমতাকে পুনরায় কেন্দ্রীভূত করার পথ প্রশস্ত করতে পারে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আলোচনার মাধ্যমে ত্রুটি সংশোধন করে আরও শক্তিশালী আইন প্রণয়নের জন্য এটি একটি প্রয়োজনীয় আইনি পর্যালোচনা মাত্র।
এই বিরোধ এখন আর সংসদের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। বিরোধী জোটগুলো এর প্রতিবাদে দেশব্যাপী আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে এক গভীরতর সংগ্রামেরই বহিঃপ্রকাশ।
বিদ্রোহ থেকে সংস্কার: কী বদলে গেল?
বর্তমান বিতর্কের মূলে রয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থান। বছরের পর বছর ধরে চলা স্বৈরাচারী শাসন, ভিন্নমত দমন, বলপূর্বক গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদে ছাত্র-জনতার এই আন্দোলন হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল।

সরকারের পতনের পর দেশে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ঐক্যের সৃষ্টি হয়েছিল। দীর্ঘদিন পর প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তায় একমত হয়েছিল। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ শুরু করে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে প্রণীত 'জুলাই জাতীয় সনদ' দুই ডজনেরও বেশি রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করেছিল। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পাশাপাশি আয়োজিত গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ নাগরিক এই সংস্কার প্রস্তাবগুলোর প্রতি সমর্থন জানান।
তবে হাসিনা পরবর্তী সময়ে সংসদ ভেঙে যাওয়ায় ইউনূস প্রশাসন এই সংস্কারগুলো পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত করতে পারেনি। পরিবর্তে তারা কয়েক ডজন অধ্যাদেশ জারি করে। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে এই অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন পেতে হয়। ২০২৬ সালের মার্চে নতুন সংসদের যাত্রা শুরু হলে এই ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার সামনে আসে। সরকারি তথ্যমতে, ১১০টি অধ্যাদেশ কিছু সংশোধনসহ পাশ হলেও ২৩টি আইন তাদের বৈধতা হারিয়েছে। যার মধ্যে মানবাধিকার কমিশন, গুম বিরোধী আইন, বিচার বিভাগীয় নিয়োগ এবং দুর্নীতি দমনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মানবাধিকার কমিশন: পরিবর্তনের প্রভাব
সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনটি এসেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (NHRC) নিয়ে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের মাধ্যমে কমিশনকে অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্বাধীন করা হয়েছিল। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা, তদন্তের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এবং প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা হয়েছিল।

কিন্তু অধ্যাদেশটি বাতিল করে এখন ২০০৯ সালের পুরনো আইন বহাল করা হয়েছে। ফলে কমিশন এখন নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি তদন্ত করতে পারবে না; কেবল সরকারের কাছে প্রতিবেদন চেয়ে সুপারিশ করতে পারবে। এতে স্বার্থের সংঘাত ও কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
সাবেক মানবাধিকার কমিশনার নাবিলা ইদ্রিস আল জাজিরাকে বলেন, “সরকার অধ্যাদেশগুলো নিয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছে।” তিনি সতর্ক করে বলেন, “আইনি সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা—উভয়ই প্রয়োজন। জবাবদিহিতা শুধু সদিচ্ছায় চলে না।”
বলপূর্বক গুম: একটি আইনি শূন্যতা
মানবাধিকার কর্মীদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলো 'বলপূর্বক গুম'। হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে সহস্রাধিক মানুষ নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ ছিল। ইউনূস প্রশাসনের তদন্ত কমিশন অন্তত ১,৫৬৯টি গুমের ঘটনা নিশ্চিত করে।
বাতিল হওয়া অধ্যাদেশটিতে 'বলপূর্বক গুম'কে একটি নির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল। এর অভাবে এখন বিচার প্রক্রিয়া এক ধরণের আইনি ধূসর এলাকায় প্রবেশ করেছে। এনএইচআরসি-র প্রাক্তন কমিশনার ইদ্রিস বলেন, “আইনে যখন অপরাধ স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত থাকে না, তখন জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।” বর্তমানে কেবল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) ঢালাওভাবে গুমের বিচার করতে পারে, কিন্তু কোনো একক মামলার বিচার বা শাস্তির স্পষ্ট বিধান ফৌজদারি আইনে নেই।
বিচার বিভাগীয় সংস্কার
বিচার বিভাগের ওপর থেকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব কমানোর লক্ষ্যে একটি স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় এবং মেধাভিত্তিক বিচারপতি নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এগুলো বাতিল হওয়ায় পুরনো ব্যবস্থাটিই বহাল থাকল। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আকবর হোসেনের মতে, “যদি প্রশাসনিক ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নির্বাহী বিভাগের প্রভাবাধীন থাকে, তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।”

সরকারের প্রতিক্রিয়া: 'পর্যালোচনা, প্রত্যাহার নয়'
সরকার সংস্কার পরিত্যাগ করার দাবি নাকচ করে দিয়ে একে 'আইনি পর্যালোচনা' হিসেবে অভিহিত করেছে। গত ১৩ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গুম ও মানবাধিকার কমিশনের মতো বিষয়গুলোতে আরও বিশদ পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে এবং শীঘ্রই অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার পর এগুলো পুনরায় কার্যকর করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “আমরা আরও শক্তিশালী আইন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। তবে ১০-১২ দিনের মধ্যে ১৩৩টি অধ্যাদেশ পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করা একটি বিশাল কাজ।” তিনি আরও জানান, বিভিন্ন আইনের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা এড়াতে তারা গুম বিরোধী আইনটিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ব্যবস্থার সাথে সমন্বিত করতে চান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ১৫ মে থেকে সকল রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এ বিষয়ে সংলাপ শুরু হবে।
বিরোধীদের ক্ষোভ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা
বিরোধী নেতারা সরকারের এই পদক্ষেপকে অভ্যুত্থানের চেতনার সাথে 'বিশ্বাসঘাতকতা' হিসেবে দেখছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের নেতা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আখতার হোসেন বলেন, “সরকার গণভোটের মাধ্যমে প্রতিফলিত জনগণের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করছে। কাঠামোগত রূপান্তর কেবল সাধারণ সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয় নয়।”

জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, “এই অধ্যাদেশগুলো তুলে দিলে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতই থেকে যায়। আর কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা সবসময়ই বিপজ্জনক।” জামায়াত প্রধান শফিকুর রহমান ইতোমধ্যে রাজপথে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সংস্কার কর্মসূচি পুনর্বহাল না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
বিশ্লেষকদের সতর্কবাণী
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক এবং 'রাইট টু ফ্রিডম'-এর সভাপতি জন ড্যানিলোভিচ মনে করেন, ২০২৪-পূর্ববর্তী আইনি কাঠামোতে ফিরে যাওয়া উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, “নিরাপত্তা বাহিনী যাতে আর কখনও এ ধরনের অপব্যবহারে লিপ্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও তদারকি অপরিহার্য।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুবাশার হাসান বলেন, এই বিতর্ক প্রমাণ করে যে সরকার সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে এবং নীতি পরিবর্তনের উদ্দেশ্য বোঝাতে হিমশিম খাচ্ছে। সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক রূপান্তরের ভবিষ্যৎ এখন সংসদ এবং রাজপথের লড়াইয়ের ওপর নির্ভর করছে।
সূত্র: আল জাজিরা