
পুলিশে প্রথমবারের মতো বিদ্যমান নিয়োগ বিধি পরিবর্তন করে সরাসরি চার হাজার উপপরিদর্শক (এসআই-নিরস্ত্র) নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামোয় ৫০০টি সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদ সৃষ্টির পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। তবে এই উদ্যোগ ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পদোন্নতির প্রচলিত ব্যবস্থা ও নিম্নপদস্থ সদস্যদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পলিসি গ্রুপের ৬ এপ্রিলের বৈঠকে এই প্রস্তাবগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পুলিশের মহাপরিদর্শকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে অতিরিক্ত আইজিপি পর্যায়ের বিভিন্ন ইউনিট প্রধান, র্যাবের মহাপরিচালক এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ পুলিশকে আরও বেশি দক্ষ, কৌশলী ও কার্যকরী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই জনবল পুনর্গঠনের ভাবনা এসেছে। তবে এর কেন্দ্রে রয়েছে পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি) সংশোধনের প্রস্তাব, যার মাধ্যমে এসআই পদে সরাসরি নিয়োগের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বর্তমানে এসআই পদের ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ এবং বাকি ৫০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। নতুন প্রস্তাবে এই ভারসাম্যে পরিবর্তনের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
এই পরিবর্তন নিয়েই মূলত সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বাহিনীর নিম্নপদস্থ সদস্যদের মধ্যে। কনস্টেবল, নায়েক ও এএসআই পর্যায়ের বহু সদস্য দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় আছেন। তাঁদের আশঙ্কা, সরাসরি নিয়োগের পরিমাণ বাড়লে পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়তে পারে, যা তাঁদের চাকরিজীবনের স্বাভাবিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, পলিসি গ্রুপের বৈঠকের পরপরই লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স শাখা থেকে পিআরবি সংশোধনের একটি খসড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সরকার অনুমোদন দিলে নতুন কাঠামোয় নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে।
বর্তমান বিধি অনুযায়ী এসআই পদের অর্ধেক পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ হওয়ার যে সুযোগ রয়েছে, সেটি সংকুচিত বা পরিবর্তিত হলে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের পদোন্নতির দীর্ঘমেয়াদি পথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের একাংশ মনে করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজশাহী রেঞ্জের এক এএসআই বলেন, ‘’যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির জন্য অপেক্ষা করছেন, তাঁদের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।‘’
তবে পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে এসআই পদ বাড়ালে নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত হবে, দীর্ঘসূত্রতা কমবে এবং মাঠপর্যায়ে দক্ষ জনবল দ্রুত যুক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ ও তদন্ত ব্যবস্থার চাপ সামলাতে এটি সহায়ক হবে বলে তাঁদের মত।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, সাইবার অপরাধ, সংগঠিত অপরাধ, মাদক চক্রসহ নানা ধরনের অপরাধ দ্রুত জটিল হয়ে উঠছে। অনলাইন জিডি, তদন্ত কার্যক্রম এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে দক্ষ জনবলের ঘাটতিও স্পষ্ট। এই বাস্তবতায় এসআই পদে সরাসরি নিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে একই বৈঠকে ৫০০টি এএসপি পদ সৃষ্টির বিষয়েও আলোচনা হয়। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার অবসরের প্রেক্ষাপটে নেতৃত্ব কাঠামো শক্তিশালী করতে এই পদগুলো সৃষ্টির পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিভিন্ন ইউনিটে ‘ক্রাইম অ্যান্ড অপস’, ‘ডিবি’ এবং ‘প্রসিকিউশন’ শাখায় এসব পদ রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে এই উদ্যোগ নিয়েও বাহিনীর ভেতরে একই ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একসঙ্গে বড় পরিসরে নতুন পদ সৃষ্টি হলে ভবিষ্যতে পদোন্নতি কাঠামোয় জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন। এএসপি পদ সৃষ্টির বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন দেবে এবং পরে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।