
জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে উদ্বেগের মাঝেই সরকার পরিষ্কার বার্তা দিল, মূল্যবৃদ্ধির কোনো পরিকল্পনা নেই। ফলে মজুত করে লাভের আশা করারও সুযোগ নেই বলে জানানো হয়েছে।
বুধবার (২৫ মার্চ) সচিবালয়ে সরকারের এক মাসের কার্যক্রম নিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং সচিব মাহবুবা ফারজানা উপস্থিত ছিলেন।
উপদেষ্টা জানান, জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। তাই পেট্রোল পাম্প মালিকসহ কেউ তেল মজুত করে বাড়তি সুবিধা পাবেন না।
তিনি বলেন, ‘আমাদের খুবই দুর্ভাগ্য, আমাদের জাতিরও দুর্ভাগ্য যে আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে একটা গ্লোবাল ক্রাইসিসে পড়েছি।’
বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘এমনকি ধনী দেশগুলো পর্যন্ত-এই যে ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে সরে আসছে চিন্তা করছে বলা হচ্ছে কারণ তার সামনে মিড-টার্ম ইলেকশন আছে। তার আগে যদি তার দেশেও প্রচুর ইনফ্লেশন হয়ে যায় সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সো আমরা আসলে মূলত ওই সংকটে পড়েছি।’
এ পরিস্থিতিতে মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে স্বাভাবিক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন সবার দায়িত্ব মানুষকে এটা বলার চেষ্টা করা-প্যানিক বায়িং এবং মজুত যেন তারা অতটা না করেন। আর হ্যাঁ, পাম্প পর্যায়ে হয়তো কেউ কেউ স্টোর করার চেষ্টা করছে। আমাদের সরকার সেগুলো একটু দেখার চিন্তা করছে।’
পাম্প মালিকদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, ‘আমি পাম্প মালিকদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই- মজুত করার যদি প্রবণতা কারো থাকে, তারা মনে করছেন যে দাম যে কোনো মুহূর্তে বেড়ে যাবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে না। সুতরাং জ্বালানি তেলের দাম যেহেতু বাড়ছে না, এই মজুত করে রাখার প্রবণতা আসলে তাদের জন্য খুব বেশি বেনিফিশিয়াল হবে না।’
সরকারের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ সম্পর্কে জবাবে উপদেষ্টা বলেন, রেশনিংয়ের বিষয়টি পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে এসেছে। তিনি ব্যাংকের উদাহরণ দিয়ে বোঝান, সবাই একসঙ্গে টাকা তুলতে গেলে যেমন ব্যাংক ধসে পড়ে, তেমনি অতিরিক্ত চাহিদা সরবরাহ ব্যবস্থাকে চাপে ফেলে।
তিনি বলেন, ‘ফুয়েলের ক্ষেত্রে একটা সরকার তার প্রতিদিন কি পরিমাণ জ্বালানি, কোন জ্বালানি কতটুকু রাখে তার একটা স্টোরেজ, তার একটা সাপ্লাই চেইন সে মেইনটেইন করে। কিন্তু ঘটনা যেটা হয়েছে এই যে প্যানিক বায়িংয়ের (আতঙ্কিত হয়ে তেল কেনা) কথা বলছি; এখন এই প্যানিক বায়িং আমিও কি করতাম না? আমিও কি আমার চারপাশের মানুষকে প্যানিক বায়িং করতে দেখছি না?’
যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগের কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধের খবরাখবর রাখছি, আমরা যে কেউ ধারণা করছি যে কিছু একটা ঘটে যেতে পারে, অবস্থা আরো খারাপ হতে পারে। সো শুধু ট্যাঙ্ক ফুল করছি শুধু না, ট্যাঙ্ক ফুল হওয়ার পর কি আমি সেখান থেকে কিছু মজুত করার চেষ্টা করছি?’
তিনি জানান, ঈদের আগে কয়েক দিনের জন্য সরবরাহ করা তেল কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়, যা আতঙ্কিত কেনাকাটার ফল। তবে এটিকে সরাসরি সরকারের ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা না বলে মানুষের ভীতি ও অসচেতনতার ফল হিসেবে দেখেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমাদের যদি সবাই মিলে একসাথে আমরা কনসাস না হই আসলে এটা হবে না। এটার একটা অপশন অন্যদিকে হতে পারতো যে পথে আমাদের সরকার যায়নি।’
জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, সরকার চাইলে অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বাড়াতে পারত। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। তবে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বিবেচনায় সে পথে যায়নি সরকার।
ঈদযাত্রার সময় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে রেশনিং সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
গ্যাস সরবরাহ প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, সরকার বর্তমানে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কিনছে। কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও পুরো সরবরাহ না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে নতুন করে সংকট তৈরি হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সবশেষে তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ে অতিরিক্ত সমন্বয়হীনতার ধারণা ঠিক নয়। কোথাও সমস্যা থাকলে তা চিহ্নিত করে সমাধান করা হবে এবং জনগণকে সঠিক তথ্য দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।