
বিশ্বজুড়ে শিশুদের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে আয়োজিত গ্লোবাল সামিটে অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। মেলানিয়া ট্রাম্প–এর আমন্ত্রণে তিনি ২৪–২৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে ওয়াশিংটন, ডি.সি.–তে দুই দিনের সরকারি সফরে রয়েছেন। “Fostering the Future Together: Global Coalition Summit” শীর্ষক এই সম্মেলনে বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশের ফার্স্ট লেডি ও রাষ্ট্রনেতাদের সহধর্মিণীরা অংশ নিচ্ছেন।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ ২০২৬) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি, যেখানে তিনি উদ্বোধনী বক্তব্য দেন।
সম্মেলনে ডা. জুবাইদা রহমান শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করা, বাংলাদেশের উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘ফার্মার্স কার্ড’ চালু এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অগ্রগতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান।
এই সফরে তার সঙ্গে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান, প্রধানমন্ত্রীর সিনিয়র চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ এবং নারী উদ্যোক্তা মেহনাজ মান্নান। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম এবং ডেপুটি চিফ অব মিশন ডি. এম. সালাহউদ্দিন মাহমুদ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলনের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ১১টি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে একটি প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়, যেখানে শিশুদের শিক্ষার উন্নয়নে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি উপস্থাপন করা হয়। ডা. জুবাইদা রহমান ও তার প্রতিনিধিদল এই প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন। বুধবার (২৫ মার্চ ২০২৬) হোয়াইট হাউস–এ আয়োজিত সমাপনী অধিবেশনে তার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
উদ্বোধনী ওয়ার্কিং সেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ডা. জুবাইদা রহমান যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডিকে ধন্যবাদ জানান বিশ্বনেতাদের শিশু উন্নয়ন ইস্যুতে একত্রিত করার জন্য। তিনি বলেন, “আজ এই ঐতিহাসিক “Fostering the Future Together: Global Coalition Summit” শীর্ষ সম্মেলনে আপনাদের সাথে যোগ দিতে পারাটা আমার জন্য এক বিরাট সম্মানের বিষয়। আমি ফার্স্ট লেডিকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই, কারণ তিনি সারা বিশ্ব থেকে আমাদের এমন একটি মহৎ উদ্দেশ্যে একত্রিত করেছেন যা প্রতিটি জাতিকে স্পর্শ করে—আমাদের শিশুদের প্রতিশ্রুতি ও সম্ভাবনা। আমরা উপলব্ধি করি যে, প্রতিটি দেশের ভবিষ্যৎ তার শিশুদের জীবনেই লেখা থাকে। আজ আমরা যে যত্ন প্রদান করি, শিক্ষায় যে বিনিয়োগ করি এবং যে মূল্যবোধ গড়ে তুলি, তা-ই আগামী দিনে তাদের গড়া জাতিকে রূপ দেবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি আমার দেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এখানে এসেছি। আমার স্বামী, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে, আমাদের সদ্য নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার বিপুল ম্যানডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রগতিশীল জাতি গঠনের লক্ষ্যে আমাদের সরকার ইতোমধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘ফার্মার্স কার্ড’-এর মতো উদ্যোগ চালু করেছে, যা পরিবারগুলোকে আর্থিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে শক্তিশালী করে এবং শিশুদের নিরাপদ ও যত্নশীল পরিবেশে বেড়ে ওঠাও নিশ্চিত করে। একজন চিকিৎসক হিসেবে, আমি প্রতিটি শিশুর জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ; যেখানে শুধু চিকিৎসার উপরই নয়, জীবনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকে প্রতিরোধের উপরও জোর দেওয়া হয়।”
শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন-জেডআরএফ” ও “সুরভী”র মতো সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ তার অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ় করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, দায়িত্বশীলভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শিক্ষাব্যবস্থাকে রূপান্তর করতে পারে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও উপকরণের ঘাটতি রয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে শিক্ষকদের ট্যাবলেট সরবরাহ, ডিজিটাল পাঠ্যক্রম চালু এবং মাল্টিমিডিয়া নির্ভর শ্রেণিকক্ষ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রযুক্তির ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, “প্রযুক্তি, বিশেষ করে শিক্ষাপ্রযুক্তি (এডটেক), শহুরে ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৈষম্য কমাতে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। একইসাথে, আমরা এই সরঞ্জামগুলোর নিরাপদ ও নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যাতে শিশুরা একটি নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশে বেড়ে ওঠে।”
নারী ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া–এর অবদান উল্লেখ করে তিনি বলেন, “নারী ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী ঐতিহ্য রয়েছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নারী অধিকারকে এগিয়ে নিয়েছিলেন এবং দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা চালু করেছিলেন। আমাদের সরকার স্নাতকোত্তর স্তর পর্যন্ত নারীদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
এছাড়া জিয়াউর রহমান–এর উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার সময়েই সরকারি খাতে ভিত্তি স্থাপনের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক নারীর কর্মসংস্থান তৈরি হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নারীরা ক্ষমতায়িত হলে পরিবার শক্তিশালী হয় এবং শিশুরাও উপকৃত হয়।
শেষে তিনি বলেন, “পরিশেষে, আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মহোদয়ার প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। জ্ঞান বিনিময়, একে অপরের কাছ থেকে শেখা এবং সীমানা পেরিয়ে সহযোগিতার মাধ্যমে, আমরা কেবল আমাদের দেশগুলোকেই শক্তিশালী করি না, বরং আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎকেও শক্তিশালী করি এবং বিশ্ব এর উত্তরাধিকারী হবে।”