
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার কে হবেন— সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দিয়েছে সরকারি সংসদীয় দল। আগামীকাল এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যেতে পারে বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
বুধবার (১১ মার্চ) জাতীয় সংসদের এলডি হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। এর আগে জাতীয় সংসদের সরকারি দলের সভাকক্ষে বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সংসদ নেতা।
সংবাদ সম্মেলনে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, “স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের জন্য আমরা সংসদ নেতাকে দায়িত্ব দিয়েছি। তিনিই সিদ্ধান্ত দেবেন, আগামীকালকে আমরা জানতে পারব। সংসদ উপনেতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী।”
তিনি আরও জানান, সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন। সংসদ সদস্যদের আচরণ, সংসদের কার্যক্রম পরিচালনা এবং কার্যপ্রণালী নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়েছে।
চিফ হুইপ বলেন, “সংসদে আমরা (এমপি) কেমন আচরণ করব এবং কার্যক্রম কী হবে, সে বিষয়ে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। সংসদে যেহেতু স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নেই, প্রথমে খালি চেয়ার দিয়ে শুরু করব। সংসদ নেতা সভার সভাপতিত্ব করার জন্য জ্যেষ্ঠ কোনো নেতার প্রস্তাব করবেন। এরপর কোনো একজন সমর্থন করবেন এবং তিনিই সভার সভাপতিত্ব করবেন। সেখানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করব।”
ডেপুটি স্পিকার পদে জামায়াতে ইসলামীকে দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি। তবে দলটি এ বিষয়ে এখনো কোনো সাড়া দেয়নি।
এ প্রসঙ্গে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী উদারতা দেখিয়ে এ প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে আমরা এখনো ইতিবাচক সাড়া পাইনি। সাড়া পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।”
তিনি জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ আগামীকাল সংসদে উপস্থাপন করবেন আইনমন্ত্রী। এসব অধ্যাদেশ যাচাইয়ের জন্য সব দলের সদস্যদের নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি নির্ধারণ করবে কোন অধ্যাদেশ কার্যকর থাকবে এবং কোনগুলো ল্যাপস বা বাতিল হবে। পরে প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাসের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
চিফ হুইপ আরও বলেন, সংসদের প্রথম দিনের বৈঠকে কার্য উপদেষ্টা কমিটি, প্রিভিলেজ কমিটি এবং হাউস কমিটি গঠন করা হবে। রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষ হওয়ার পর দিনের অধিবেশন মুলতবি করা হবে। ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলীও মনোনীত করা হবে।
এছাড়া অধিবেশনে শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। সেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে আলোচনা হবে। পাশাপাশি জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে আলোচনা এবং দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্যও শোকপ্রস্তাব আনা হবে।
জুলাই জাতীয় সনদে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, সংবিধানে এ বিষয়ে বিধান না থাকায় তারা শপথ নেননি। ভবিষ্যতে সংবিধানে এটি যুক্ত হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
লিখিত বক্তব্যে চিফ হুইপ বলেন, “মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ভাতের অধিকার নিশ্চিত করা এবং গণতন্ত্রকে সুসংহত করার লক্ষ্যে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তারই ধারাবাহিক প্রতিফলন হচ্ছে আজকের এই জাতীয় সংসদ। জাতীয় সংসদ কেবল একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশের মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আস্থা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে আগামীকাল থেকে জাতীয় সংসদের নতুন অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে। এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আমরা দেশবাসীর কাছে দোয়া ও সমর্থন কামনা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “আগামীকাল যে সংসদ অধিবেশন শুরু হবে, সেটি হবে জনগণের সংসদ-দেশের মানুষের অধিকার, আশা এবং স্বপ্নের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে— একটি কার্যকর, প্রাণবন্ত ও দায়িত্বশীল সংসদ পরিচালনা করা। আমরা চাই, সংসদে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা, যুক্তিপূর্ণ তর্ক ও সুস্থ বিতর্কের পরিবেশ সৃষ্টি হোক।”
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, “গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো— মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা। সেই লক্ষ্যেই আমরা সংসদকে একটি কার্যকর ও অর্থবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই প্রেক্ষাপটে আমরা দেশের জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন কামনা করছি। একই সঙ্গে আমরা বিরোধী দলের গঠনমূলক ভূমিকা ও সহযোগিতাও প্রত্যাশা করি। আমরা বিশ্বাস করি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের সমাধান করা সম্ভব এবং সেই পথ ধরেই আমরা জাতিকে আরও শক্তিশালী ও স্বাবলম্বী ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে পারব।”
শেষে তিনি বলেন, “আমাদের অঙ্গীকার হচ্ছে— সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করা, দারিদ্র্য দূর করা এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করে তোলা। একটি কার্যকর সংসদের মাধ্যমে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়াই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। পরিশেষে দেশবাসীর কাছে আবারও দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করছি, যাতে আমরা সবাই মিলে একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে পারি।”