
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর জনগণের রায়ে গঠিত সরকারের নেতৃত্বে দাঁড়িয়ে সীমান্ত ও জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় সেনা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দেশের স্বার্থে সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে আধুনিক ও সুসংহত করা হবে।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় ও ইফতার অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ সংগ্রামের পর আজ জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে। দেশের প্রশ্নে সীমান্ত বাহিনীকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করে গড়ে তোলা হবে এবং সদস্যরা দেশপ্রেম ও পেশাগত উৎকর্ষতায় সীমান্তে দায়িত্ব পালন করবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালের পিলখানায় শাহাদাতবরণকারী সদস্যদের পরিবারবর্গ ও নিকটাত্মীয়রা এবং সে সময় সেখানে দায়িত্ব পালনকারী সেনা কর্মকর্তারা এখনও সেই দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন।
তিনি বলেন, "মাহে রমজানের এই পড়ন্ত বিকেলে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের, ৯০ -এর গণআন্দোলন এবং ২৪ -এর গণঅভ্যুত্থানে শাহাদাতবরণকারী সব ছাত্র-জনতাকে। গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে শাহাদাতবরণকারী ৫৭ জন দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন বীর শহীদকে। আমি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত শহীদ পরিবারবর্গের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।"
২৫ ফেব্রুয়ারিকে জাতির ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর দিন হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, "আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি; জাতির ইতিহাসে এক রক্তাক্ত ও বেদনাবিধুর দিন। এই দিনটি এলে প্রকৃতি যেন আবার স্মৃতি ও শোকের ভারে নীরব হয়ে যায়, বাতাসে ভেসে আসে সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের আর্তনাদ। আমাদের হৃদয় গভীর বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারির এই নির্মম ঘটনা আমাদের জাতীয় জীবনে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে, যার বেদনা সময় পেরিয়ে আজও বহমান।"
তিনি আরও বলেন, "ঘটনার দীর্ঘ ১৭ বছর পরে শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত এই প্রাঙ্গণে আজ আমার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসছে। আমি কেবল একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে নয়, একজন সেনা পরিবারের সদস্য হিসেবে, একজন সহযোদ্ধার সন্তানের মতো আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। ২০০৯ সালের সেই বিভিষীকাময় ঘটনায় ৫৭ জন মেধাবী ও দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাসহ সর্বমোট ৭৪টি প্রাণ ঝরে গিয়েছিল। প্রতিটি নাম একটি পরিবারের আলো নিভে যাওয়ার গল্প, প্রিয়জন হারানোর বেদনাবিধুর অধ্যায়, একটি সন্তানের পিতৃহীন হওয়ার ইতিহাস, একটি স্বপ্নের অসমাপ্ত মহাকাব্য। আমি দেশে প্রত্যাবর্তনের পরপরই বনানী সামরিক কবরস্থানে গিয়ে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করেছি—গত ১৭ বছরে আপনাদের দুর্বিষহ সংগ্রাম, অপরিসীম ত্যাগ আর দ্বারে দ্বারে ঘুরে বিচার না পাওয়ার নিদারুণ যন্ত্রনা।"
পিলখানার ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্মরণ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, "আমি বিশ্বাস করি, পিলখানার ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্মরণ করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারির ঘটনাকে ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। তাই সেনাবাহিনী ও আপনাদের সঙ্গে আলোচনা করে ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারির স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে বর্তমান সরকার কাজ করবে।"
সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ঐতিহাসিক ভূমিকার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি তৎকালীন ইপিআরের সদস্যরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার সময় ইপিআর সদস্যরা দায়িত্বে ছিলেন এবং গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী হন। পরবর্তীতে সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে সুসংহত করতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সংস্কার কার্যক্রম শুরু করা হয়। ১৯৭৮ সালে সামরিক কায়দায় পুনর্গঠন করে উইংগুলোকে ব্যাটালিয়নে রূপান্তর এবং দুটি নতুন ব্যাটালিয়ন সংযোজনের মাধ্যমে বাহিনীকে আরও সম্প্রসারিত করা হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও দেশগঠনে সেনাবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনী দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। তার মতে, পিলখানার মর্মান্তিক ঘটনা ছিল সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করার একটি অপপ্রয়াস। ওই ঘটনার মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর কিছু দুর্বলতা সামনে আসে। তাই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
একই সঙ্গে শহীদ পরিবারের সদস্যদের কল্যাণে তাদের সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।