
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম চিরস্মরণীয় হয়ে আছে—তাদের সংগ্রাম, আদর্শ ও দেশপ্রেম জাতির চেতনায় স্থায়ীভাবে অঙ্কিত। তেমনই এক ব্যক্তিত্ব হলেন অলি আহাদ—ভাষা আন্দোলনের অন্যতম বীর সেনানী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ।
তার একমাত্র কন্যা রুমিন ফারহানা বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের সংসদ সদস্য ও একজন ব্যারিস্টার। ছোটবেলা থেকেই তিনি বাবার রাজনৈতিক সংগ্রাম ও নিপীড়নের সাক্ষী ছিলেন। ২০২২ সালে দৈনিক যুগান্তর–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বাবার মৃত্যুর দিনটি তার কাছে পৃথিবীর সবকিছু হারানোর সমান ছিল।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
১৯২৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন অলি আহাদ। তার পিতা আবদুল ওহাব ছিলেন শিক্ষিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। পড়াশোনা করেন ঢাকা কলেজ এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এ ভর্তি হন। তবে ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। দীর্ঘ ৫৮ বছর পর, ২০০৬ সালে সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।
ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলন শুরু হলে তিনি সামনের সারিতে অবস্থান নেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অভিযোগে গ্রেফতার হন এবং দীর্ঘদিন কারাবরণ করেন। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয়তা
অলি আহাদ রাজনীতি করেছেন এ কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেখ মুজিবুর রহমান–এর মতো প্রখ্যাত নেতাদের সঙ্গে। ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক মেরুকরণের পক্ষে অবস্থান নেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও তিনি সক্রিয় সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও নীতির প্রশ্নে আপস না করে পরবর্তীতে বিচ্ছিন্ন হন। পরে তিনি ডেমোক্রেটিক লীগ প্রতিষ্ঠা করেন, যা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক হয়।
সংগ্রাম, পুরস্কার ও উত্তরাধিকার
সামরিক শাসনের বিরুদ্ধেও তার অবস্থান ছিল দৃঢ়। এরশাদ আমলে তিনি একাধিকবার গ্রেফতার হন এবং তার সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি আপসহীন ছিলেন।
তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তার রচিত বই ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-১৯৭৫’ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত।
অলি আহাদের স্ত্রী ছিলেন প্রফেসর রশিদা বেগম। দীর্ঘ বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার পর ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তবে তার আদর্শ ও সংগ্রাম আজও প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছে।