
নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করা যুক্তরাষ্ট্রের দুই সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক আলবার্ট গোম্বিস ও মর্স ট্যান মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় সৌজন্য সাক্ষাতে এলে প্রধান উপদেষ্টা এ কথা বলেন। বুধবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বিষয়টি জানানো হয়।
সাক্ষাতে প্রফেসর ইউনূস বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে ভুয়া খবর ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। তবে এসব অপপ্রচারের মধ্যেও অন্তর্বর্তী সরকার ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্তে অনড়। তিনি জানান, নির্বাচনের ফল ঘোষণা শেষে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “কে কী বলল, তা বিবেচ্য নয়। নির্ধারিত ১২ ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে; এর একদিন আগেও নয়, একদিন পরেও নয়।”
তিনি আরও বলেন, ভোটগ্রহণ হবে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে। নির্বাচনকালীন পুরো সময়জুড়ে অন্তর্বর্তী সরকার নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে এবং সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে পক্ষপাতমুক্ত প্রশাসন পরিচালনা করবে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভারপ্রাপ্ত আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট আলবার্ট গোম্বিস এবং সাবেক অ্যাম্বাসাডর-অ্যাট-লার্জ মর্স ট্যান নির্বাচন সামনে রেখে বর্তমানে বাংলাদেশ সফরে রয়েছেন।
প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠকে আসন্ন নির্বাচন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পরিস্থিতি, তরুণ আন্দোলনকারীদের উত্থান, জুলাই সনদ ও গণভোট, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভুয়া খবর ও মিসইনফরমেশন, রোহিঙ্গা সংকট এবং জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ উদ্যোগের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, অন্তর্বর্তী সরকার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। জনগণের সমর্থন পেলে জুলাই সনদ গণতান্ত্রিক শাসনের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে এবং ভবিষ্যতে স্বৈরশাসনের পথ বন্ধ করবে।
প্রফেসর ইউনূস বলেন, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের সমর্থকেরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুয়া খবর ও অপতথ্য ছড়িয়ে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাচ্ছে। তবে জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে।
এ বিষয়ে একমত পোষণ করে আলবার্ট গোম্বিস বলেন, ভুয়া খবর বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের “প্রধান শত্রুদের একটি” হয়ে উঠেছে এবং এ হুমকি মোকাবিলায় আরও শক্ত উদ্যোগ প্রয়োজন।
দুই সাবেক কূটনীতিক গত দেড় বছরে সরকার পরিচালনায় প্রধান উপদেষ্টার ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং জানতে চান, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য-পরবর্তী অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব কি না।
এ প্রসঙ্গে প্রফেসর ইউনূস বলেন, প্রয়াত নেলসন ম্যান্ডেলা তাঁর বন্ধু ছিলেন এবং তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার সেই প্রক্রিয়া কাছ থেকে দেখেছেন। তবে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট শাসকগোষ্ঠী তাদের অপরাধ স্বীকার না করায় বর্তমানে বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়নি।
তিনি বলেন, “সময় এখনো উপযুক্ত নয়। কোথা থেকে শুরু করবেন? ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন তখনই সম্ভব, যখন কেউ স্বীকার করে যে সে ভুল করেছে, নিজের অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হয়, অনুশোচনা প্রকাশ করে।”
তিনি আরও বলেন, “কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের কোনো অনুশোচনা নেই, কোনো অনুতাপ নেই। বরং তারা দাবি করছে যে জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত তরুণরা সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়েছে। তাদের অপরাধের বিপুল পরিমাণে প্রমাণ রয়েছে। তারা যা করেছে তা সম্পূর্ণ বর্বরোচিত অপরাধ, তবু তারা সম্পূর্ণ অস্বীকারের অবস্থানেই রয়েছে।”
বৈঠকে এসডিজি সমন্বয়ক ও সিনিয়র সচিব লামিয়া মোর্শেদ উপস্থিত ছিলেন।