
ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াইয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত বাংলাদেশ এখন নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও দেশটির অভিযোজন সক্ষমতা ধীরে ধীরে সীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছে গবেষকরা।
ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইসিসিসিএডি)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ুজনিত দুর্যোগের মাত্রা ও ঘনত্ব এমনভাবে বাড়ছে যে বিদ্যমান নীতি ও অভিযোজন কৌশল ভবিষ্যতে দেশের মানুষ, অবকাঠামো ও পরিবেশকে সুরক্ষা দিতে যথেষ্ট নাও হতে পারে।
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের অনেক মানুষের মতো শাহানাজ আলীর জীবনও ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে কেটেছে। ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ভোলা ঘূর্ণিঝড়ে তার পরিবার ঘরবাড়ি হারায়, প্রাণ হারান আত্মীয়স্বজনও। সেই স্মৃতি এখনও তাকে তাড়া করে ফেরে। বর্তমানে বরিশালে বসবাস করলেও জলবায়ু ঝুঁকির কারণে বারবার স্থান পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা তার জীবনের অংশ হয়ে আছে।
বিশ্বের বৃহত্তম গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপে অবস্থিত বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। তবে গত দুই দশকে দুর্যোগ মোকাবিলা, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও স্থানীয় উদ্যোগের কারণে উল্লেখযোগ্য সাফল্যও অর্জন করেছে দেশটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ১৮৫টি বড় ধরনের চরম আবহাওয়া ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ছিল ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, তাপপ্রবাহ ও খরা।
আইসিসিসিএডির উপপরিচালক অধ্যাপক মিজান খান বলেন, শতাব্দীর শেষ নাগাদ নিম্ন নির্গমন পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশে গড় তাপমাত্রা আরও ০.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাত ও নদীর প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যার ঝুঁকিও আরও তীব্র হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু অভিযোজনে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে উদাহরণ সৃষ্টি করলেও স্থানীয় পর্যায়ে এখনও অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে। নীতির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ, অর্থায়ন বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বরিশালে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির উদ্যোগে গঠিত নারী নেতৃত্বাধীন ‘হাতখোলা স্কোয়াড’ স্থানীয় জনগণকে ঘূর্ণিঝড় ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সহায়তা করছে। সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতা তৈরি করেন এবং নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিশ্চিত করেন। তবে অর্থের সংকটের কারণে তাদের কার্যক্রম সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত পরিকল্পনা, স্থানীয় অভিযোজন উদ্যোগ, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় ন্যায্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর—এই চারটি ক্ষেত্রকে গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ তার বার্ষিক বাজেটের প্রায় ৭ শতাংশ জলবায়ু অভিযোজন খাতে ব্যয় করে, যার বড় অংশই আসে নিজস্ব অর্থায়ন থেকে। তবে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বর্তমান ব্যয়ের তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি অর্থ প্রয়োজন হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবেশমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশ শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার নয়, বরং এই সংকট মোকাবিলার বৈশ্বিক নেতৃত্বও দিচ্ছে। তবে অভিযোজনেরও একটি সীমা রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সময়ের সঙ্গে এর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাবও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তাই সংকট মোকাবিলায় উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান