
পবিত্র ঈদুল আজহা সমাগত। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে সামর্থ্যবান মুসলমানদের ওপর কুরবানী করা ওয়াজিব। তবে ঠিক কতটুকু সম্পদের মালিক হলে একজন মুসলিমের ওপর কুরবানী শরিয়ত অনুযায়ী বাধ্যতামূলক বা ওয়াজিব হয়, তা নিয়ে প্রতি বছরই সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন জাগে। ইসলামী শরিয়তের বিধান এবং বর্তমান (মে ২০২৬) বাজারমূল্যের আলোকে এর একটি স্পষ্ট রূপরেখা দিয়েছেন আলেম ও ফিকহ বিশেষজ্ঞরা।
ইসলামী ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ‘ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী’ (৫/২৯২) অনুযায়ী, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন মুসলমান যদি জিলহজ্জ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখের মধ্যে নিজের প্রয়োজনীয় খরচ ও ঋণ বাদ দিয়ে ‘নিসাব’ পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তবে তার ওপর কুরবানী করা ওয়াজিব।
কুরবানীর নিসাব ও বর্তমান বাজার দর (মে ২০২৬)
শরিয়তের প্রাচীন নিয়ম অনুযায়ী কুরবানীর নিসাব হলো— সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে ৫২ ভরি রৌপ্য (রুপা), কিংবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ বা ব্যবসায়িক পণ্য।
ইসলামী আইনজ্ঞদের মতে, বর্তমান যুগে স্বর্ণের চেয়ে রুপার দাম কম হওয়ায় সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে এবং গরিব-মিসকিনদের অধিক কল্যাণের কথা বিবেচনা করে রুপার নিসাবকেই মানদণ্ড ধরা হয়। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সর্বশেষ নির্দেশিকা (২৫ মে, ২০২৬) অনুযায়ী, বর্তমানে ২২ ক্যারেট প্রতি ভরি রুপার বাজারমূল্য ৫,৭৭৪ টাকা।
সেই হিসাবে সাড়ে ৫২ ভরি রুপার বর্তমান বাজারমূল্য দাঁড়ায়:
৫,৭৭৪* ৫২.৫ = ৩,০৩,১৩৮ টাকা (প্রায়)
অর্থাৎ, এই বছর কুরবানীর দিনগুলোতে কোনো ব্যক্তির কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ ও ঋণ বাদে আনুমানিক ৩ লাখ ৩ হাজার টাকা বা এর সমপরিমাণ মূল্যের নগদ অর্থ, স্বর্ণ-রুপা বা ব্যবসায়িক পণ্য থাকলে তার ওপর কুরবানী দেওয়া ওয়াজিব হবে।
কোন কোন সম্পদ নিসাবের আওতায় আসবে?
ফাতাওয়ায়ে শামি ও আল-হিদায়াহর কিতাব অনুসারে, নিসাব নির্ধারণের সময় নিচের সম্পদগুলো হিসাব করতে হবে:
হাতে বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা উদ্বৃত্ত নগদ টাকা।
গহনা বা বার হিসেবে থাকা সোনা ও রুপা।
ব্যবসার উদ্দেশ্যে মজুত রাখা পণ্য বা মালামাল।
জীবিকার প্রধান মাধ্যম ছাড়া অতিরিক্ত জমি, ফ্ল্যাট, সঞ্চয়পত্র বা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ।
তবে নিজের বসবাসের বাড়ি, নিত্য ব্যবহারের গাড়ি, ঘরের আসবাবপত্র, পরিধেয় পোশাক কিংবা দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্র এই নিসাবের আওতাভুক্ত হবে না।
ঋণ ও নারীদের কুরবানী সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা
কোনো ব্যক্তির ওপর তাৎক্ষণিক পরিশোধযোগ্য ঋণ থাকলে, মোট সম্পদ থেকে ঋণের পরিমাণ বাদ দিতে হবে। ঋণ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পদ যদি রুপার নিসাবের (প্রায় ৩ লাখ ৩ হাজার টাকা) বেশি থাকে, তবেই কুরবানী ওয়াজিব হবে (বাহরুর রায়েক ৮/১৯৭)।অনেকের ধারণা, কেবল পরিবারের কর্তার ওপরই কুরবানী ওয়াজিব। তবে শরিয়তের অমোঘ বিধান হলো— কোনো নারীর যদি নিজস্ব মালিকানায় নিসাব পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার বা নগদ অর্থ থাকে, তবে স্বামীর সম্পদের ওপর নির্ভর না করে ওই নারীর নিজের নামে আলাদা কুরবানী দিতে হবে (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া ৫/২৯৩)।
তদুপরি, জাকাতের মতো এই সম্পদের ওপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়; কুরবানীর ৩ দিনের যেকোনো সময় এই পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়াই যথেষ্ট।সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা কুরবানী আদায় করেন না, তাদের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন— “যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস: ৩১২৩)। তাই শরিয়তের এই গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব বিধানটি সঠিকভাবে পালনের জন্য নিজ নিজ সম্পদ ও ঋণ হিসাব করার আহ্বান জানিয়েছেন ওলামায়ে কেরাম।
মুহা. সিয়াম, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক