
বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জেনসেন হুয়াংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়ানো এক নারী চীনের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করতেন বলে সন্দেহ করছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা। ওই নারীকে হুয়াংয়ের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে ট্রাম্প প্রশাসনকে জানিয়েছেন মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
এ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ঘটনাটির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটির কংগ্রেস।
মার্কিন গোয়েন্দাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চলতি বছরের শুরুতে একটি গোপন স্মারক তৈরি করেন দেশটির কর্মকর্তারা। এতে দাবি করা হয়, সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেগাস্পিডের নির্বাহী অ্যালিস হুয়াংয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন জেনসেন হুয়াং। মেগাস্পিড এনভিডিয়ার একজন গ্রাহক।
গত মে মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে ওই গোপন স্মারকটি পৌঁছে দেওয়া হয়।
বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেনসেন হুয়াং। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিপ তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। এ কারণে কোনো চীনা গোয়েন্দা কর্মকর্তার প্রভাবের কারণে হুয়াং মার্কিন জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি করেছেন কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেসে দুই দলের অংশগ্রহণে বড় পরিসরে তদন্তের সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে জেনসেন হুয়াং ও অ্যালিস হুয়াংয়ের সম্পর্ক নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যালিস চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের হয়ে কাজ করতেন বলে মার্কিন গোয়েন্দাদের ধারণা।
তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের এআই প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত চিপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছিল চীনা গোয়েন্দা সংস্থাটি। একই সঙ্গে এনভিডিয়াকে তাদের সবচেয়ে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর চীনে বিক্রির বিষয়ে রাজি করানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। তবে জেনসেন হুয়াংয়ের সঙ্গে অ্যালিসের পরিচয় কখন এবং কীভাবে হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
শুক্রবার রাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করেন, জেনসেন হুয়াংয়ের সঙ্গে অ্যালিসের প্রেমের সম্পর্ক ছিল।
এদিকে আগামী জানুয়ারি থেকে সিনেটের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিতে যাওয়া ডেলাওয়্যারের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস কুনস ঘটনাটি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কংগ্রেসীয় তদন্তের ঘোষণা দিয়েছেন।
তিনি বিষয়টিকে ‘ট্রাম্প প্রশাসন, চীনা গুপ্তচর এবং এআই বিলিয়নিয়ারদের মধ্যে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘কংগ্রেস এর তদন্ত করবে এবং জবাব আদায় করবে।’
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে প্রতিনিধি পরিষদের চীনবিষয়ক, পররাষ্ট্রবিষয়ক ও গোয়েন্দাবিষয়ক কমিটির রিপাবলিকান প্রধানেরা জেনসেন হুয়াংকে আগামী ১১ নভেম্বরের মধ্যে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সেখানে তাকে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য ও তথ্য দিতে হবে।
তবে এনভিডিয়া এবং জেনসেন হুয়াং এসব অভিযোগ বারবার নাকচ করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, অ্যালিস হুয়াংয়ের সঙ্গে জেনসেনের সম্পর্ক ছিল পুরোপুরি পেশাগত ও ব্যবসায়িক। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে প্রতিবছর হাজার হাজার গ্রাহক ও প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। অ্যালিসের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। তাদের মধ্যে কোনো সংবেদনশীল তথ্য বিনিময় হয়নি বলেও দাবি করেছে এনভিডিয়া।
চীন সরকারও জেনসেন হুয়াংকে ঘিরে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। বেইজিংয়ের দাবি, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা।
অ্যালিস হুয়াংয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে ২০২৩ সালে একটি চীনা গেমিং প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা হয়ে মেগাস্পিড প্রতিষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে চীনে চিপ সরবরাহের সন্দেহ রয়েছে, সেগুলোর কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত করছে যুক্তরাষ্ট্র। এনভিডিয়াও এ বিষয়ে আগে নিজস্ব অভ্যন্তরীণ তদন্ত চালিয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সেই তদন্তে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
চীনে এনভিডিয়ার চিপ বিক্রির অনুমতি দেওয়া নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও একাধিকবার মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এনভিডিয়ার তৈরি চিপ চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে পৌঁছাচ্ছে।
এদিকে জেনসেন হুয়াংয়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের অসন্তোষের কথাও জানা গেছে। চলতি বছরের শুরুতে ট্রাম্পের কাছে ব্যক্তিগতভাবে তদবির করে চীনে এনভিডিয়ার তৈরি এইচ২০০ চিপ রপ্তানির অনুমতি চেয়েছিলেন হুয়াং। ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর ট্রাম্পের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন এনভিডিয়া প্রধান।