
ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে নিউইয়র্কে প্রবেশের ভিসা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। অথচ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ তাঁকে ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যক্রমে অংশগ্রহণের অধিকার এবং আয়োজক দেশের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আইনি ও কূটনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, জাতিসংঘের মঞ্চে কে কথা বলবেন, তা নির্ধারণের চূড়ান্ত ক্ষমতা কার হাতে—আন্তর্জাতিক সংস্থার, নাকি তার সদর দপ্তর যে দেশের ভূখণ্ডে অবস্থিত, সেই দেশের?
গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে এক সপ্তাহ ধরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা অংশ নেন। তবে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো এবারও ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের ভিসা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের যুক্তি, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপও মার্কিন আপত্তির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে।
কিন্তু জাতিসংঘ এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদে ১৫২-৩ ভোটে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে না পারা ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের ভিডিওর মাধ্যমে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ও জাতিসংঘের অন্যান্য সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দপ্তরও এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে। জাতিসংঘের কাজে অংশ নিতে আসা প্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
১৯৪৭ সালের চুক্তি কী বলছে, কোথায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা?
ফিলিস্তিন জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যরাষ্ট্র নয়। সংস্থাটিতে দেশটির মর্যাদা ‘পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’। তবে পূর্ণ সদস্য না হওয়ার অর্থ এই নয় যে, ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিরা জাতিসংঘের কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না। তাঁদের অংশগ্রহণের সুযোগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আইনি ও কূটনৈতিক আলোচনা চলছে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ১৯৪৭ সালের জাতিসংঘ-যুক্তরাষ্ট্র সদর দপ্তর চুক্তি, যা ‘হেডকোয়ার্টার্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ নামে পরিচিত। চুক্তির ১১ নম্বর ধারায় জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধি এবং সংস্থাটির আমন্ত্রণে সরকারি কাজে সদর দপ্তরে আসা ব্যক্তিদের সদর দপ্তর এলাকায় যাতায়াতে বাধা না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
চুক্তির ১২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, এই প্রবেশাধিকারের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজ দেশের সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল হবে না। আর ১৩ নম্বর ধারায় স্পষ্ট করা হয়েছে, বিদেশিদের প্রবেশসংক্রান্ত মার্কিন আইন এমনভাবে প্রয়োগ করা যাবে না, যাতে ১১ নম্বর ধারায় নির্ধারিত প্রবেশাধিকারের সুবিধা ব্যাহত হয়। যাঁদের ভিসা প্রয়োজন, তাঁদের দ্রুত ও বিনা মূল্যে ভিসা দেওয়ার বিধানও রয়েছে চুক্তিতে।
তবে জাতিসংঘের সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে অবস্থিত হওয়ায় প্রতিনিধিদের ভিসা ও প্রবেশের বিষয়টি মার্কিন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। ফলে মূল আইনি প্রশ্নটি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসাব্যবস্থা প্রয়োগের ক্ষমতা কি এমন পর্যায়ে ব্যবহার করা যেতে পারে, যাতে জাতিসংঘের সরকারি কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগই বাধাগ্রস্ত হয়?
জাতিসংঘের নথিতে ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদের বিষয়ে আগেও এ ধরনের অবস্থানের উল্লেখ রয়েছে। প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) জাতিসংঘে স্থায়ী পর্যবেক্ষক মিশনের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সদর দপ্তর চুক্তির ১১, ১২ ও ১৩ নম্বর ধারা প্রযোজ্য বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ জাতিসংঘের সরকারি কাজে নিউইয়র্কে আসার ক্ষেত্রে তাঁদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে—এমন অবস্থান জাতিসংঘের ছিল।
সদর দপ্তরে প্রতিনিধিদের প্রবেশাধিকার নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিরোধ অবশ্য নতুন নয়। রাশিয়া, কিউবা ও ভেনেজুয়েলার প্রতিনিধিদের ভিসা, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং সদর দপ্তরে প্রবেশের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে জাতিসংঘে বিতর্ক হয়েছে। আব্বাসের ঘটনা সেই দীর্ঘদিনের বিরোধকে আবার সামনে এনেছে।
ফিলিস্তিন ও ইরানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত এক নয়
এবারের অধিবেশনে ইরানের প্রতিনিধিদলকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তও বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের ভিসা না দিলেও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং দেশটির মূল প্রতিনিধিদলকে সাধারণ পরিষদে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেয় ওয়াশিংটন। তবে তাঁদের চলাচল নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার শর্ত দেওয়া হয়।
এখানে দুই দেশের ক্ষেত্রে মার্কিন সিদ্ধান্তের পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধিদের ভিসা দিয়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও তাঁদের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া কারণও দুই ক্ষেত্রে এক নয়।
তাই দুটি ঘটনাকেই শুধু ‘জাতিসংঘে প্রবেশে যুক্তরাষ্ট্রের বাধা’ হিসেবে দেখলে আইনি ও কূটনৈতিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আড়ালে থেকে যায়। বরং এ থেকে প্রশ্ন ওঠে, জাতিসংঘের অধিবেশনে অংশগ্রহণের সুযোগ কি শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদার ওপর নির্ভর করে, নাকি সদর দপ্তরের আয়োজক দেশের ভিসা ও চলাচলসংক্রান্ত সিদ্ধান্তও সেই সুযোগ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে?
ভিডিওতে বক্তব্য আর সরাসরি উপস্থিতি কি সমান?
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ কেবল রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ সময় বিভিন্ন দেশের নেতাদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, অনানুষ্ঠানিক আলোচনা, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং পর্দার আড়ালের সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়।
আব্বাস ভিডিওর মাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি পেলেও নিউইয়র্কে সশরীরে উপস্থিত থাকার সুযোগ পাননি। ফলে অন্য রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক, অনানুষ্ঠানিক আলোচনা কিংবা তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে তাঁর অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ে। এসব কার্যক্রমের বিকল্প হিসেবে ভিডিও সংযোগ কতটা কার্যকর হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এখানেই আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সরাসরি উপস্থিত থাকার মধ্যে পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। কোনো নেতাকে বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হলেও তাঁকে সরাসরি উপস্থিত হতে না দিলে আন্তর্জাতিক আলোচনায় তাঁর অংশগ্রহণের পরিধি কতটা অক্ষুণ্ণ থাকে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
জাতিসংঘ একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হলেও এর সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে। ফলে একদিকে রয়েছে আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ও প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, অন্যদিকে রয়েছে জাতিসংঘের কার্যক্রম পরিচালনা এবং সেখানে আমন্ত্রিত প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা।
কোনো রাষ্ট্র যদি নিজের ভূখণ্ডে অবস্থিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাজে অংশ নিতে আসা ব্যক্তিদের প্রবেশ সীমিত করে, তাহলে সেই ক্ষমতার সীমা কোথায়—এ প্রশ্ন সামনে আসে। একইভাবে, জাতিসংঘ যদি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে সেই অধিকার বাস্তবে কার্যকর করার উপায় কী, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
মাহমুদ আব্বাসের ঘটনা এই বিরোধের চূড়ান্ত সমাধান দেয় না। বরং ১৯৪৭ সালে গড়ে ওঠা আইনি কাঠামোকে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যায়—জাতিসংঘের মঞ্চ যদি আন্তর্জাতিক সংলাপের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার কথা হয়, তবে সেখানে পৌঁছানোর অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষমতা কার? জাতিসংঘের, নাকি যে দেশের ভূখণ্ডে সংস্থাটির সদর দপ্তর অবস্থিত, সেই দেশের?