
ভোরের অন্ধকার কাটার আগেই একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ। রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নেন শহরের বাসিন্দারা। পরে ঘনবসতিপূর্ণ দারনিতস্কি এলাকায় হামলার পর আগুনে দুইজন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেন কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো।
ক্লিৎসকো জানান, বুধবারের হামলায় আগুন নেভানোর সময় দুইজনকে উদ্ধার করা হয়। পরে ঘটনাস্থল থেকে আরও দুইজনের মরদেহ পাওয়া যায়। তিনি বার্তায় লেখেন, ‘আগুন নেভানোর সময় দুইজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত দুইজনের মরদেহ পাওয়া গেছে।’
এর আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাজধানী কিয়েভে বড় ধরনের হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। রাতে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘রাশিয়া বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে—এ বিষয়ে আমাদের কাছে নতুন গোয়েন্দা তথ্য আছে।’ একই সঙ্গে হামলা মোকাবিলায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
জেলেনস্কির সতর্কবার্তার পর বুধবার ভোরে কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলার সতর্কতা জারি করা হয়। বাসিন্দাদের অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য মেট্রো স্টেশনে চলে যান। তাদের কারও হাতে ছিল বড় ব্যাগ, কারও সঙ্গে ছিল ঘুমানোর মাদুর ও কম্বল।
ব্যাংককর্মী ইরিনা রিবালচেঙ্কো মেট্রোর প্ল্যাটফর্মে নিজের ব্যাগের পাশে বসে বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে এখানে চলে এসেছি। আমরা এখান থেকে একেবারে পাশেই থাকি।’ পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘পুরো কিয়েভ এখন আতঙ্কের মধ্যে আছে। আজ আমরা কর্মস্থলে আটকে পড়েছিলাম। সবাই—আমাদের দলের সদস্যরা, এমনকি কর্মকর্তারাও—বার্তা পাঠিয়ে আমাদের সাবধানে থাকতে বলছিলেন।’
৩৬ বছর বয়সী দারিয়া মেদভেদেভাও হামলার আতঙ্কের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘শিশুরা ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। যখনই ব্যাপক গোলাবর্ষণ হয়, আমরা মাটির নিচে যাওয়ার চেষ্টা করি।’
এএফপির এক সাংবাদিক বুধবার ভোরে কিয়েভে অবস্থানকালে পরপর কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। ইউক্রেনের বিমানবাহিনীও সতর্ক করে জানায়, একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কিয়েভের দিকে এগিয়ে আসছে। সামরিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন মাধ্যমের আশঙ্কা ছিল, বড় ধরনের হামলায় ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি দ্রুতগতির জেটচালিত ড্রোনও ব্যবহার করা হতে পারে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শীত ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে কিয়েভে রুশ হামলার মাত্রা বেড়েছে। জ্বালানি অবকাঠামোর পাশাপাশি রেল ও সড়ক যোগাযোগব্যবস্থাও হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। এর মধ্যে দিনিপ্রো নদীর দুই পাড়ে বিস্তৃত রাজধানীকে সংযুক্ত করা সেতুগুলোও রয়েছে।
জেলেনস্কির ভাষণের কিছুক্ষণ পর কিয়েভের কয়েকটি এলাকায় নির্ধারিত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতেই শহরের কিছু অংশে এভাবে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হয় বলে জানানো হয়েছে।
কিয়েভের বাইরে ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সুমি অঞ্চলেও রুশ ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। দেশটির জাতীয় পুলিশ জানিয়েছে, ওই হামলায় দুইজন নিহত ও বহু মানুষ আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৭, ১৪ ও ১৬ বছর বয়সী তিন শিশুও রয়েছে। একটি আবাসিক ফ্ল্যাটে হামলা হলে তারা আহত হয়।
এদিকে ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যাওয়ার কথা জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে হামলায় যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর আগে গত সপ্তাহে কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো বলেছিলেন, রাজধানীকে এখন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তাঁর ভাষায়, সেতু ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে শত্রুরা ‘কিয়েভকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে’।