
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গত ৮০ বছরে ইতালিতে ৬৮টি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এত সরকারের কেউই যে রেকর্ড গড়তে পারেনি, এবার সেটিই করে দেখাল দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার। একটানা ক্ষমতায় থাকার হিসাবে ইতালির ইতিহাসে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে তার নেতৃত্বাধীন সরকার।
শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
২০২২ সালের ২২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন জর্জিয়া মেলোনি। এরপর কেটে গেছে ১ হাজার ৪১৩ দিন। এর আগে ইতালিতে একটানা সবচেয়ে বেশি সময় সরকার পরিচালনার রেকর্ড ছিল ধনকুবের সিলভিও বার্লুসকোনির দখলে। তিনি টানা ১ হাজার ৪১২ দিন ক্ষমতায় ছিলেন। এক দিনের ব্যবধানে সেই রেকর্ড এখন ছাড়িয়ে গেল মেলোনির সরকার।
নিজের কট্টর ডানপন্থি সরকারের এই দীর্ঘস্থায়িত্ব উদযাপন করতে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন মেলোনি।
বারিতে সমাবেশ, থাকছে পাল্টা বিক্ষোভও
মাইলফলক উদযাপনে শুক্রবার ইতালির বারি শহরে একটি সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ অংশ নেবেন বলে আয়োজকদের প্রত্যাশা। তবে একই সময় অনুষ্ঠানস্থলের কাছেই মেলোনিবিরোধী বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মেলোনি বলেন, ‘আজ, আমাদের সরকার ইতালীয় প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিদিন ধরে ক্ষমতায় থাকার মাইলফলক অর্জন করল।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি এই কৃতজ্ঞতা ও গভীর দায়িত্ববোধের সঙ্গে এই অর্জনকে স্বাগত জানাই। স্থিতিশীলতা অর্জন করা সবাইকে বলে বেড়ানোর মতো কোনো রেকর্ড নয়। কিন্তু একটি জাতিকে পরিকল্পনা করতে, সিদ্ধান্ত নিতে, অঙ্গীকার রক্ষা করতে এবং সবার কাছ থেকে সম্মান আদায় করতে হলে (স্থিতিশীলতার) এই শর্ত পূরণ অপরিহার্য।’
মেলোনির কট্টর ডানপন্থি দল ব্রাদার্স ফর ইতালি বা এফডিআইয়ের সমর্থকেরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কোচে করে দক্ষিণের পুলিয়া অঞ্চলের রাজধানী বারিতে পৌঁছাচ্ছেন।
আয়োজকদের হিসাবে, বন্দর এলাকার অনুষ্ঠানস্থলে প্রায় ১০ হাজার মানুষের সমাগম হতে পারে।
সন্ধ্যায় সেখানে জড়ো হওয়া মানুষের উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন মেলোনি। একই সময়ে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত হবেন দুই উপ-প্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি ও আন্তোনিও তাজানি।
২০২৭ সালের নির্বাচন সামনে রেখে প্রচারণার আভাস
বিশ্লেষকদের ধারণা, শুধু সরকারের দীর্ঘস্থায়িত্ব উদযাপন নয়, ২০২৭ সালের নির্বাচন সামনে রেখেও এই সমাবেশকে রাজনৈতিক প্রচারণার কাজে ব্যবহার করতে চাইছেন মেলোনি।
অনুষ্ঠানের সূচনা হবে ডিজেরা গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে।
সমাবেশের জন্য নির্ধারিত স্লোগান হলো—‘ইল গোভের্নো পিউ স্তাবিলে, ল’ইতালিয়া পিউ ফোর্তে’, যার অর্থ ‘সবচেয়ে স্থিতিশীল সরকার, সবচেয়ে শক্তিশালী ইতালি’।
চার বছর ধরে ক্ষমতায় থাকার সময়ে তার সরকারের বিভিন্ন অর্জনের কথা অনুষ্ঠানে তুলে ধরবেন মেলোনি।
১০ লাখ কর্মসংস্থান, কমেছে আয়কর
মেলোনি সরকারের দাবি অনুযায়ী, তাদের চার বছরের শাসনামলে নতুন করে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। একই সময়ে ব্যক্তি পর্যায়ের আয়কর ২১ বিলিয়ন ইউরো বা প্রায় ২ লাখ ৯৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা কমানো হয়েছে।
দীর্ঘদিন ঋণের চাপে থাকা ইতালিও মেলোনির সময়ে আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জন করেছে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে।
তবে সরকারের এই স্থিতিশীলতার দাবির সঙ্গে অর্থনৈতিক বাস্তবতার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সমালোচকেরা। তাদের বক্তব্য, আর্থিক স্থিতিশীলতা এলেও সেই অনুপাতে অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি।
‘মানুষ এখন অবসর নিতে পারছে না’
মেলোনি সরকারের দীর্ঘস্থায়িত্ব উদযাপনের আয়োজন নিয়ে সমালোচনা করেছেন সিজিআইএল ট্রেড ইউনিয়নের প্রধান মরিজিও লানদিনি।
তিনি বলেন, ‘কারও বেতন কি বেড়েছে? না। পেট্রোলের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। চাকরির নিরাপত্তা কমেছে। মানুষ এখন অবসর নিতে পারছে না আর স্বাস্থ্যসেবাও আগের মতো কার্যকর নেই।’
অবৈধ অভিবাসন কমানোর দাবি
অবৈধ অভিবাসন কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০২২ সালের নির্বাচনে জয় পেয়েছিল ব্রাদার্স ফর ইতালি। দলটির দাবি, চার বছরের মধ্যে ইতালিতে অবৈধ অভিবাসন ৮০ শতাংশ কমেছে।
মেলোনির সরকারের মাইলফলক উদযাপনের অনুষ্ঠানেও স্থানীয় সংস্কৃতির ছাপ থাকছে। সেখানে বারি শহরের ঐতিহ্যবাহী অ্যাসাসিন স্প্যাগেটি পরিবেশন করা হবে। এই খাবারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এতে অত্যন্ত ঝাল ও ধোঁয়াটে স্বাদের সস ব্যবহার করা হয়।
‘যুদ্ধ ও অস্ত্রের অর্থনীতি’ তৈরির অভিযোগ
মেলোনির সরকারের সমর্থকেরা যখন বারিতে দীর্ঘস্থায়িত্ব উদযাপন করবেন, তখন একই শহরে তার বিরোধীরাও বিক্ষোভ করবেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, মেলোনির নেতৃত্বে ইতালিতে একটি ‘যুদ্ধ ও অস্ত্রের অর্থনীতি’ গড়ে উঠেছে। তাদের আরও দাবি, ইতালি এখন একটি ‘পুলিশি রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়েছে এবং দেশটিতে অভিবাসীদের প্রতি ঘৃণার সংস্কৃতিও তৈরি হয়েছে।