
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা ও ইরানকে ঘিরে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে তিনি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত ও বহুমুখী করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মোদি বলেন, ‘আগামী দিনে আমরা আমাদের বাণিজ্যিক পণ্যের পরিধি বাড়াতে এবং তা বহুমুখী করতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছি।’
দুই নেতার এ বৈঠক বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে, কারণ গত ছয় মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের পর এটিই তাদের প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ। বৈঠকে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়। মোদি বলেন, ‘আগামী দিনে আমরা আমাদের বাণিজ্যিক পণ্যের পরিধি বাড়াতে এবং তা বহুমুখী করতে চাই।’
দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পক্ষে ভারতের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের আলোচনা হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে যে কোনো ধরনের প্রচেষ্টাকে ভারত সমর্থন করে যাবে।’
ইরানের সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যেখানে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৭ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে।
মোদির বাণিজ্য বাড়ানোর বক্তব্যের বিস্তারিত পরিকল্পনা অবশ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার মাত্র সাত দিনের মাথায় এমন মন্তব্য করায় তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে।
গত সপ্তাহে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করতে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করার পর ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রিকেও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়—এ পরিস্থিতিতে ভারত কীভাবে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াবে।
জবাবে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মূলত বর্তমান সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা খুঁজে বের করার কথা বলেছেন। এক্ষেত্রে অর্থায়ন, বিমা, পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যবস্থার বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
বর্তমানে ভারত-ইরান বাণিজ্য মূলত বেসরকারি পক্ষের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থার বিভিন্ন বিধিনিষেধ মেনেই এসব প্রতিষ্ঠানকে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।
দুই দেশের পরিবহন ও সামুদ্রিক সহযোগিতার প্রসঙ্গে ইরানের পক্ষ থেকে চাবাহার বন্দরের বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। এ বিষয়ে বিক্রম মিশ্রি বলেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দরের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি জানান, বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে একটি ‘টেকসই পথ খুঁজে বের করার’ চেষ্টা করছে ভারত। বিশেষ করে আঞ্চলিক যোগাযোগে চাবাহার বন্দরের ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
চাবাহার বন্দরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড়ের মেয়াদ চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল শেষ হয়। এরপর বন্দরটির পরিচালনা থেকে ভারতকে সরে আসতে হয়। এর আগে চাবাহারে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছিল নয়াদিল্লি।
ভারতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।
পেজেশকিয়ান বলেন, ‘রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর ব্যাপক সক্ষমতা ইরান ও ভারতের রয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা শক্তিশালী করার পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলা করতে পারলে আমরা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারব।’
দূতাবাসের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে ভারতের বিস্তৃত যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে যুদ্ধ ও রক্তপাতের পথ থেকে সরে এসে সংলাপ ও সমঝোতার পথে ফিরতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সহায়তা করার জন্য মোদিকে অনুরোধ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট।
এদিকে সাংহাই কো-অপারেশন সম্মেলনের ফাঁকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন মোদি। চলতি বছরে দুই নেতার এটি ছিল প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ।
ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি জানান, বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বাড়তে থাকা বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে ভারতের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানির কারণে এ ঘাটতি আরও বেড়েছে।
মিশ্রি বলেন, ‘বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাশিয়ায় ভারতের রপ্তানি বাড়ানোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আলোচনা চলছে।’
তিনি জানান, গত বছর বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে পুতিন ভারতে গেলে মোদি তার হাতে একটি নথি তুলে দিয়েছিলেন। এতে রাশিয়ার বাজারে ভারতীয় পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন বাধা, বিশেষ করে কিছু অশুল্ক প্রতিবন্ধকতার বিষয় তুলে ধরা হয়েছিল।
ভারতের পররাষ্ট্রসচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, রুশ সহযোগিতায় এসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। মাংস, সামুদ্রিক খাবার ও কিছু দুগ্ধজাত পণ্যের রপ্তানির ক্ষেত্রে রাশিয়ার বাজারে প্রবেশের সুযোগও আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে।