
পশ্চিম তীরে সেনাবাহিনীর পরিবর্তে বেসামরিক পুলিশ বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েল। এই উদ্যোগকে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে নেওয়ার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। লন্ডনভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ গত শুক্রবার জানান, অধিকৃত পশ্চিম তীরে বেসামরিক বিষয়সংক্রান্ত আইন প্রয়োগের দায়িত্ব সেনাবাহিনীর কাছ থেকে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা তৈরির জন্য তিনি সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। কাৎজের দপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই পরিকল্পনার আওতায় ‘বেসামরিক বিষয়গুলো মোকাবিলা ও সমাধানের জন্য একটি উপযুক্ত বাহিনী প্রতিষ্ঠা’ করতে হবে পুলিশকে। অন্যদিকে সেনাবাহিনী শুধু ‘ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসবাদ’ মোকাবিলা এবং সীমান্ত ও বসতিগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজে মনোযোগ দেবে।
কাৎজের ভাষ্য, পশ্চিম তীরে বেসামরিক বিষয় তদারকির দায়িত্ব পুলিশের হাতে তুলে দেওয়াই যৌক্তিক। কারণ, ‘ইসরায়েল রাষ্ট্রের অন্য সব জায়গায়’ এ ধরনের দায়িত্ব পুলিশই পালন করে। তবে এই ঘোষণা দেওয়ার আগে সেনাবাহিনী বা পুলিশের সঙ্গে কোনো ধরনের সমন্বয় করা হয়নি। যদিও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইসরায়েল হায়োম শুক্রবার জানিয়েছে, সেনাবাহিনী এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে এবং কয়েক সপ্তাহ ধরেই এ ধরনের পরিবর্তনের জন্য চাপ দিয়ে আসছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীর তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও এ ঘোষণা দেওয়ার আগে বিষয়টি সম্পর্কে জানতেন না। এখন পর্যন্ত পরিকল্পনাটি নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে বসতি স্থাপনকারী নেতাদের কয়েকজন কাৎজের এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন।
পশ্চিম তীরের বিনইয়ামিন আঞ্চলিক পরিষদের প্রধান ইসরায়েল গানজ বলেন, কাৎজের ঘোষণার পর অসলো চুক্তি বাতিল করে অধিকৃত ভূখণ্ডে ‘পূর্ণ ইসরায়েলি সার্বভৌমত্ব’ প্রতিষ্ঠা করা উচিত। গানজ বলেন, ‘অস্থায়ী ব্যবস্থাপনা থেকে সরে এসে এখন ইসরায়েলি আইন পুরোপুরি প্রয়োগের সময় এসেছে।’
সেনাবাহিনীর অনুরোধ
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াই নেট জানিয়েছে, শুক্রবারের ঘোষণার পেছনে সেনাপ্রধান আইয়াল জামিরের অনুরোধ রয়েছে। পশ্চিম তীরে সেনাবাহিনীর ওপর কাজের চাপ কমাতেই তিনি এ অনুরোধ করেছিলেন। দুই সপ্তাহ আগে ইসরায়েলি মন্ত্রিসভাকে জামির জানিয়েছিলেন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব ক্রমেই বাড়ছে। কারণ, ‘শিগগিরই নতুন বসতি প্রতিষ্ঠিত হবে।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মন্ত্রীদের উদ্দেশে জামির বলেছিলেন, ‘কয়েকজন মানুষ বসতিগুলোর বদনাম করছে বলে তাদের পেছনে ছুটে বেড়ানো আইডিএফের (ইসরায়েলি সেনাবাহিনী) সেনাদের জন্য অসহনীয়।’
এ বক্তব্যে তিনি ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়গুলোকে সন্ত্রস্ত করার অভিযোগে অভিযুক্ত বসতিস্থাপনকারীদের কথা উল্লেখ করেন। জামির বলেন, সেনাবাহিনী ‘পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতায় কাজ করছে’, তবে এ ধরনের দায়িত্ব থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সরে আসাই যথাযথ।
শুক্রবার ওয়াই নেটকে দেওয়া এক বক্তব্যে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র জানান, পশ্চিম তীরে ‘নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে কর্তৃত্বের বিভাজন’ পর্যালোচনার জন্য সেনাবাহিনী ‘অভ্যন্তরীণ ও প্রাথমিক পর্যায়ের স্টাফ-লেভেলের কাজ’ পরিচালনা করছে।
কাৎজের বিবৃতিতে পুরো পশ্চিম তীরের কথা বলা হয়েছে। সেখানে পশ্চিম তীরের এরিয়া এ ও বি-এর মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। অসলো চুক্তির আওতায় এই দুই এলাকায় বেসামরিক বিষয়গুলো ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করে। অন্যদিকে এরিয়া সি-তে ইসরায়েল বেসামরিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে।
ইসরায়েল কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিম তীরকে নিজেদের ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করেনি। ১৯৬৭ সাল থেকে অঞ্চলটি ইসরায়েলি সামরিক দখলের অধীনে রয়েছে। তবে গত এক বছরে ইসরায়েলি সরকার এমন বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেগুলো বিশেষজ্ঞদের মতে কার্যত বা ‘ডি-ফ্যাক্টো সংযুক্তির’ সমতুল্য।
এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে পশ্চিম তীর পরিচালনায় বেসামরিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা বাড়ানো এবং যেসব ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগতভাবে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখত, সেসব জায়গায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা কমিয়ে আনা। ইসরায়েলি ও আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে পশ্চিম তীরে দখলদার কর্তৃপক্ষ হিসেবে সেনাবাহিনীই দায়িত্ব পালন করে। বেসামরিক বিষয়সহ সেখানে আইন প্রয়োগের ক্ষমতাও সেনাবাহিনীর হাতে রয়েছে।
বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধি
পশ্চিম তীরজুড়ে বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার মধ্যেই কাৎজের এই ঘোষণা এসেছে। সপ্তাহের শুরুতে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা নাবলুসের দক্ষিণে অবস্থিত কুসরা গ্রামে ফিলিস্তিনি বাড়িঘর অবরুদ্ধ করে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানালেও শুক্রবার পর্যন্ত বসতিস্থাপনকারীরা ওই এলাকায় অবস্থান করছিল। গত সপ্তাহে ওয়াই নেটের প্রবীণ সামরিক প্রতিবেদক রন বেন-ইশাই বলেছিলেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং শিন বেত—এই তিনটি সংস্থাই ‘আইন প্রয়োগ করতে অক্ষম।’ তাঁর ভাষায়, উগ্রপন্থী বসতিস্থাপনকারীদের একটি ছোট দল কার্যত ‘পশ্চিম তীরে সার্বভৌম’ হয়ে উঠেছে। তিনি আরও বলেন, সেনাবাহিনী শুধু ‘তাদের এবং তাদের খেয়ালখুশির নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।’
শুক্রবার বেন-ইশাই বলেন, কাৎজের ঘোষণা ‘ডি-ফ্যাক্টো সংযুক্তির’ সমতুল্য। একই সঙ্গে তিনি এই পদক্ষেপের আইনি ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। বেন-ইশাইয়ের বক্তব্য, পশ্চিম তীরে বেসামরিক কর্তৃত্ব গ্রহণ করার মতো পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ কর্মকর্তাও ইসরায়েলি পুলিশের নেই।