
ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন শেষে তুরস্ক থেকে ফেরার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হঠাৎ বিমান পরিবর্তনের নেপথ্যে ছিল প্রাণঘাতী নিরাপত্তা হুমকি। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার হাতে এমন তথ্য আসে যে, ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ট্রাম্পকে বহনকারী বিমানকে আকাশেই লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা করেছিল। সেই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই জরুরি ভিত্তিতে ট্রাম্পের ভ্রমণ পরিকল্পনা বদলে দেওয়া হয়।
রোববার (২৬ জুলাই) প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ন্যাটো সম্মেলন চলাকালেই মার্কিন প্রশাসনের হাতে নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য পৌঁছায়। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, হুমকির গুরুত্ব বিবেচনায় প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা দল তাৎক্ষণিকভাবে বিকল্প ব্যবস্থা নেয়।
তুরস্ক সফরে ট্রাম্প কাতারের উপহার হিসেবে পাওয়া বোয়িং ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজে গিয়েছিলেন। তবে বিমানটিতে পুরোনো ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এর মতো পূর্ণাঙ্গ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও উন্নত নিরাপত্তা প্রযুক্তি না থাকায় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। পরিস্থিতি মূল্যায়নের পর মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস ট্রাম্পকে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ফিরতে জোরালো পরামর্শ দেয় এবং শেষ পর্যন্ত সেটিই বাস্তবায়ন করা হয়।
মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট বিমান ছিল না। বরং ট্রাম্প যে উড়োজাহাজেই থাকুন না কেন, সেটিকেই আকাশে ধ্বংস করার পরিকল্পনা ছিল তাদের।
ন্যাটো সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা মার্কিন নেতাকে—অর্থাৎ আমাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চায়। আমি তাদের প্রতিটি তালিকায় আছি। আজ সকালেও আমি দেখেছি যে তাদের করা প্রতিটি হিটলিস্টে আমার নাম রয়েছে। এত দিন ধরে আমি হয়তো কিছুটা ভাগ্যবান ছিলাম, তবে এ ভাগ্য হয়তো খুব বেশি দিন না-ও টিকতে পারে।’
তবে শুরুতে বিমান পরিবর্তনের কারণ হিসেবে নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা অস্বীকার করেছিলেন ট্রাম্প। তিনি বলেছিলেন, ব্রিটেনে অবস্থানরত মার্কিন সেনাসদস্যদের নতুন উড়োজাহাজ দেখানোর সুযোগ করে দিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরে প্রকাশিত অনুসন্ধানে উঠে আসে, মূলত সিক্রেট সার্ভিসের সুপারিশেই বিমান বদলের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গোয়েন্দা তথ্যটি অত্যন্ত সীমিত পরিসরে রাখা হয়েছিল। প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাকে কেবল ‘ইরানসংক্রান্ত সাধারণ নিরাপত্তা উদ্বেগের’ কথা জানানো হয়। এমনকি কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদেরও বিস্তারিত ব্রিফিং দেওয়া হয়নি। যদিও হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ট্রাম্পকে হত্যার লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়ে ইরানের ধারাবাহিক তৎপরতার কথা স্বীকার করে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেন।
একই সময়ে ইসরাইলও ট্রাম্পকে হত্যার সম্ভাব্য হুমকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিছু গোয়েন্দা তথ্য ভাগ করে নেয়। তবে মার্কিন প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা সেই তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাদের ধারণা ছিল, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বড় সামরিক পদক্ষেপে উৎসাহিত করতেই ওই তথ্য দেওয়া হয়েছিল। তবে তুরস্কে ট্রাম্পের বিমান পরিবর্তনের পেছনের গোয়েন্দা তথ্য ইসরাইলের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে কাতারের উপহার দেওয়া নতুন উড়োজাহাজের নিরাপত্তা ঘাটতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর তথ্য ফাঁসের অভিযোগে তদন্ত শুরু করে মার্কিন সরকার। তদন্তের অংশ হিসেবে কয়েকজন সাংবাদিক ও তাদের স্বজনদের ফোন রেকর্ড চেয়ে আইনি নোটিশও দেওয়া হয়েছিল। পরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে গত বৃহস্পতিবার সেসব নোটিশ প্রত্যাহার করে নেয় মার্কিন বিচার বিভাগ।
গত রোববার ট্রাম্পও স্বীকার করেন, নতুন উড়োজাহাজটিতে এখনো পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানের সব ধরনের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি যুক্ত হয়নি। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, অতিরিক্ত নিরাপত্তা আধুনিকায়নের জন্য আগামী শরতে প্রায় এক মাস নতুন বিমানটি সেবার বাইরে রাখা হবে। ওই সময়ে ট্রাম্প পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানেই ভ্রমণ করবেন।
এদিকে সিক্রেট সার্ভিসের পরিচালক শন কারান সম্প্রতি বলেছেন, তাদের সুরক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বর্তমানে যে ধরনের হুমকি রয়েছে, তা সংস্থাটির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুতর পর্যায়ের একটি।
মার্কিন গোয়েন্দাদের ধারণা, ২০২০ সালে ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা কাসেম সোলাইমানি যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত হওয়ার পর থেকেই ইরান-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ট্রাম্পকে লক্ষ্যবস্তু করার সুযোগ খুঁজে আসছে।
তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস