
পশ্চিম আফ্রিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ মালিতে আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র সংগঠন ‘জামা’আত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন’ (জেএনআইএম)-এর ওপর বিমান বা সামরিক হামলার পরিকল্পনা বিবেচনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। এটি বাস্তবায়িত হলে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক অভিযানের তালিকায় অষ্টম দেশ হিসেবে যুক্ত হবে মালি। তবে রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি ও বৈশ্বিক যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কারণে ওয়াশিংটনের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই পদক্ষেপ নিয়ে চরম মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এ প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সামরিক শক্তি প্রযোগের পক্ষে সরব ভূমিকা রাখছেন ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সন্ত্রাসবাদবিরোধী পরিচালক সেবাস্টিয়ান গোরকা। তবে সংবেদনশীল সামরিক বিষয় হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আলোচনার তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
উল্লেখ্য, জেএনআইএম বর্তমানে সাহেল অঞ্চলে বিশাল সামরিক ঘাঁটি গেড়ে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক মিত্রদের ওপর হামলা বাড়িয়ে চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন থেকে আঞ্চলিক ন্যাটোর সদস্য ও আফ্রিকান অংশীদারদের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে সহায়তার আহ্বান জানানো হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজারকে নিয়ে গঠিত 'অ্যালাইয়ান্স অব সাহেল স্টেটস'-কে সুরক্ষা দিতে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন। তবে একই সাথে তিনি মালির জান্তা সরকারের নিরাপত্তা অংশীদার রাশিয়ার চরম ব্যর্থতার কড়া সমালোচনা করে বলেন, মস্কো মালির জন্য একেবারেই অকার্যকর এক মিত্র হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
রুশ উপস্থিতি ও মানবিক বিপর্যয়
বর্তমানে আড়াই কোটি জনসংখ্যার স্থলবেষ্টিত মালি ও তার আশপাশের সাহেল অঞ্চল বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। গত বছর জেএনআইএম দেশের ওপর জ্বালানি অবরোধ আরোপের পর চলতি বসন্তে রাজধানী বামাকোসহ বিভিন্ন অঞ্চলে একযোগে রক্তক্ষয়ী হামলা চালায়। হামলা চালিয়ে তারা সেনাসদস্যদের হত্যা ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সাদিও কামারাকে আত্মঘাতী বোমায় হত্যা করে।
সহিংসতা মোকাবিলায় সামরিক জান্তা প্রথমে ক্রেমলিন সমর্থিত ‘ওয়াগনার গ্রুপ’ এবং পরবর্তীতে 'আফ্রিকা কর্পস'-এর রুশ ভাড়াটে সেনাদের নিয়োগ দেয়। তবে ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা’ (ACLEDI) প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গিদের চেয়ে মালির সেনাবাহিনী ও তাদের রুশ মিত্রদের হাতে বহুগুণ বেশি সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছে। গত বছর রুশ-মালি যৌথ অভিযানে ৯২৫ জন নিরীহ বেসামরিক মানুষ নিহত হলেও ইসলামপন্থী জঙ্গিদের হাতে মারা যান ২৩২ জন।
বর্তমানে চরম অস্থিতিশীল এই পরিস্থিতিতে ইসলামিক স্টেটের শাখা 'আইএস সাহেল'-ও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। গত বছর তাদের হাতে অপহৃত মার্কিন খ্রিস্টান মিশনারি কেভিন রাইডআউট এখনও দেশটিতে বন্দি রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কৌশলগত সংকট ও সম্ভাব্য ঝুঁকি
ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে ইয়েমেন, সোমালিয়া, সিরিয়া, ইরান, ইরাক, নাইজেরিয়া এবং ভেনেজুয়েলায় সামরিক স্ট্রাইক পরিচালনা করেছে। এর আগে বাইডেন প্রশাসন মালির জান্তা সরকারের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখলেও ট্রাম্প প্রশাসন অপহৃত আমেরিকানদের উদ্ধার ও আকাশসীমার পূর্ণ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে জান্তা সরকারের ওপর থেকে একাধিক নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেয়।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, কোনো রকম দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া কেবল বিমান হামলা সমস্যার কোনো সমাধান আনবে না। সাহেল বিশেষজ্ঞ ওয়াসিম নাসর মন্তব্য করেন:
"আরেকবার সামরিক সমাধানের পথ বেছে নিলে সমস্যার সমাধান হবে না। ফ্রান্স ১০ বছর ধরে সেটাই করেছে। রাশিয়া পাঁচ বছর ধরে চেষ্টা করছে। কিন্তু পরিস্থিতি শুধু আরও খারাপ থেকে খারাপতর হয়েছে।"
এর বাইরে, সাউফান সেন্টার এবং স্বাধীন বিশ্লেষক কোরিন ডুফকার মতে—যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হামলায় জড়ালে এতদিন স্থানীয়ভাবে লড়া জেএনআইএম আবার মূল আল-কায়েদা নেতৃত্বের সাথে জোরালোভাবে হাত মেলাতে পারে। পাশাপাশি সেখানে অবস্থানরত রুশ আফ্রিকান কর্পস সেনাবহরের সাথে সরাসরি মার্কিন বাহিনীর সামরিক সংঘাতের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হবে।