
ইরানের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বাড়তেই বিকল্প তেল রপ্তানি পথ তৈরিতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ সচল রাখতে একের পর এক নতুন পাইপলাইন নির্মাণ ও সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে এপি নিউজ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছাত। তবে বর্তমানে প্রণালিটিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজের বিকল্প রপ্তানি অবকাঠামো গড়ে তুলতে জোর দিচ্ছে।
সরকারি কর্মকর্তা, তেল কোম্পানি ও জ্বালানি বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত সাতটি বড় পাইপলাইন প্রকল্প বর্তমানে নির্মাণাধীন, পরিকল্পনাধীন অথবা সম্ভাব্য প্রকল্প হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। এসব প্রকল্পের লক্ষ্য লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল এবং ওমান উপসাগরসংলগ্ন বন্দরগুলোতে সরাসরি তেল পৌঁছে দেওয়া, যাতে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার না করেই রপ্তানি চালানো সম্ভব হয়।
তবে বিকল্প রুটও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। সম্প্রতি ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজ চলাচলে অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। তবু সাম্প্রতিক সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, ইরানের উপকূলঘেঁষা হরমুজ প্রণালির ওপর দীর্ঘমেয়াদে অতিনির্ভরতা নিরাপদ কৌশল নয়।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের জ্যেষ্ঠ গবেষক ভিক্টোরিয়া গ্রাবেনভ্যোগার বলেন, ‘হরমুজের ওপর এত বেশি নির্ভরশীল থাকা এখন আর দীর্ঘমেয়াদে বিচক্ষণ কৌশল নয়।’
ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় ১৯৮০-এর দশকে সৌদি আরব ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন নির্মাণ করে। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে আবকাইক থেকে তেল লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু বন্দরে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ট্যাংকারে করে আরব সাগর ও সুয়েজ খাল হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল পাঠানো হয়।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ওমান উপসাগর তীরবর্তী ফুজাইরাহ বন্দরের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে সৌদি আরব ও ইউএইর বিদ্যমান পাইপলাইনগুলোতে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৩৫ থেকে ৫৫ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা ছিল। বর্তমানে সেগুলো প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে।
একই সঙ্গে আবুধাবির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি প্রায় ৩০০ কোটি ডলার ব্যয়ে ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন একটি পাইপলাইন নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। বিদ্যমান লাইনের সমান্তরালে ফুজাইরাহ পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রকল্প চালু হলে প্রতিদিন অতিরিক্ত ১২ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল পরিবহন সম্ভব হবে। প্রকল্পটির প্রায় অর্ধেক কাজ শেষ হয়েছে। ২০২৭ সালের শুরুতে এটি চালুর লক্ষ্য থাকলেও ফুজাইরাহ বন্দরের সম্প্রসারণের কারণে সময়সীমা ২০২৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত গড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ইরাকও বসরা তেলক্ষেত্র থেকে বিকল্প রপ্তানি রুট গড়ে তোলার উদ্যোগ জোরদার করেছে। হরমুজ প্রণালির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে দেশটি ইতোমধ্যে তেল উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। ভবিষ্যতে তুরস্ক ও সিরিয়ার দিকে নতুন পাইপলাইন সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে, যদিও এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও সময় লাগবে।