
বিএনপি সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর বদলে যাওয়া বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল ও নতুন বৈশ্বিক পররাষ্ট্রনীতি কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করতে চলতি জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে ঢাকা সফরে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাসের মাথায় এটিই হতে যাচ্ছে কোনো মার্কিন বিশেষ দূতের প্রথম বাংলাদেশ সফর। ওয়াশিংটন ও ঢাকার মধ্যকার এই কূটনীতিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, রুটিন দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বাইরে বিশেষ কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখেই বিশেষ দূতদের পাঠানো হয়ে থাকে। ফলে সার্জিও গোরের এই সফরের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হবে নতুন ঢাকা প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির নতুন দিকনির্দেশনা ও অবস্থান অনুধাবন করা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক দায়িত্বশীল জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান আগামী ২৮ জুলাই বিদেশ সফর শেষে দেশে প্রত্যাবর্তন করবেন। তাঁর সেই সময়সূচি বিবেচনায় রেখেই মার্কিন বিশেষ দূতের আনুমানিক সফরসূচি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদালয়ের গ্র্যাজুয়েট ও ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত। মার্কিন কংগ্রেসের হাউস ও সিনেটে কাজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা এই অভিজ্ঞ কর্মকর্তা সরাসরি হোয়াইট হাউসে তাঁর কাজের রিপোর্ট পেশ করে থাকেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের ঠিক এক মাসের মাথায় মার্কিন দূতের এই ঝটিকা আগমন ভূ-রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ওই চীন সফরে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, তিস্তা নদী সংক্রান্ত বহুল আলোচিত প্রকল্প, প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং চট্টগ্রামে একটি বিশেষ চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা নিয়ে বেশ কিছু বড় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
একই সময়ে বাংলাদেশের সাথে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কূটনৈতিক যোগাযোগে নতুন গতি লক্ষ্য করা গেছে—সম্প্রতি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ঢাকা ঘুরে গেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীন সফর সম্পন্ন করেছেন এবং রিয়াদ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও উচ্চপর্যায়ের সফরের জন্য নিমন্ত্রণ এসেছে। তাছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সম্প্রতি রাশিয়া সফর করে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই লাভরভের সাথে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন।
কূটনৈতিক গবেষকরা বলছেন, নিয়মিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় থাকলেও বিশেষ এই সফরের মূল ফোকাস থাকবে বেইজিং ও মস্কোর সাথে ঢাকার বিদ্যমান সম্পর্কের গভীরতা পরিমাপ করা। পাশাপাশি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক ভারসাম্যের সমীকরণ, পাকিস্তান বিষয়ে বর্তমান মনোভাব, ঝুলে থাকা রোহিঙ্গা ইস্যু এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও ইরান পরিস্থিতি নিয়েও দুপক্ষের মধ্যে বিস্তর আলোচনা হতে পারে।
জটিল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বড় বড় পরাশক্তিগুলোর সাথে সুসম্পর্ক রেখে বাংলাদেশ যেভাবে নিজস্ব ও স্বাধীন ভারসাম্যপূর্ণ নীতি বজায় রাখছে, তা পর্যালোচনার জন্য এই সফর ঢাকা ও ওয়াশিংটন উভয় পক্ষের জন্যই অত্যন্ত কৌশলগত।