
লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় গত জুন মাসে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর সেখানে এক মানবিক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা নিখোঁজদের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। প্রলয়ংকরী এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৯৩০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে জাতিসংঘের আশঙ্কা, এখনও প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষের নিচে আটকা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদন থেকে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) ভেনেজুয়েলার আইনপ্রণেতা হোর্হে রদ্রিগেজ দেশটিতে প্রাণহানির এই সর্বশেষ সরকারি সংখ্যা প্রকাশ করেন।
২১ হাজারেরও বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে, ত্রাণ কার্যক্রমে ধীরগতির অভিযোগ
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভয়াবহ এই দুর্যোগে আহত হয়েছেন প্রায় ১৭ হাজার নাগরিক। ঘরবাড়ি হারিয়ে বর্তমানে ২১ হাজার ১২০ জন মানুষ বিভিন্ন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ভূমিকম্পের পরপরই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান শুরু হলেও প্রশাসনের উদ্ধার তৎপরতা অত্যন্ত ধীরগতির ছিল বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ভূমিকম্পের আঘাতে বাস্তুচ্যুত হওয়া সিনথিয়া পুলিদো আল জাজিরাকে বলেন:
"ভূমিকম্পের পরপরই সাধারণ মানুষ ও স্বেচ্ছাসেবকেরা উদ্ধারকাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু সরকারের কার্যকর উপস্থিতি অনেক পরে দেখা গেছে। আমরা এখনও সহায়তার অপেক্ষায় আছি।"
বর্তমানে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো উদ্ধারকাজ সমাপ্ত করে নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছে। ফলে এখন উদ্ধার অভিযানের চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও গৃহহীন মানুষের কাছে জরুরি মানবিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়াকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আরেক বাস্তুচ্যুত নাগরিক লুইসমারেজ পায়েজ তাঁর কঠিন পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে বলেন:
"যেটুকু সহায়তা পাই, তা দিয়ে কোনোমতে নিজের জীবন চালাই, সন্তানদের দেখাশোনা করি এবং মাকে সাহায্য করি।"
তিনি জানান, তাঁর বৃদ্ধা মা সরকারের পক্ষ থেকে অন্য কোনো সাহায্য পাচ্ছেন না; তিনি নিজে যা পাচ্ছেন, তা দিয়েই মায়ের দেখাশোনা করছেন।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও পুনর্গঠনের বিশাল ব্যয়
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৫ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জারি করা কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকায় ভেনেজুয়েলার জন্য এত বড় আকারের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষত কাটিয়ে ওঠা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক 'সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ'-এর জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ মার্ক ওয়েইসব্রট এ প্রসঙ্গে বলেন, ভেনেজুয়েলার নিজস্ব অনেক আর্থিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও নিষেধাজ্ঞাগুলোর কারণে দেশটিকে সেগুলো ব্যবহারে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ব্যাংকগুলোতে ভেনেজুয়েলার প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ আটকে রাখা হয়েছে, যা আইনগতভাবে দেশটির প্রাপ্য।
এদিকে, দুর্যোগপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি উঠেছে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ জন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা হোয়াইট হাউসকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছেন। সেখানে তাঁরা জরুরি ত্রাণ তৎপরতা সহজ করতে এবং ভেনেজুয়েলার পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে অবিলম্বে দেশটির ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
জাতিসংঘের প্রাথমিক হিসাব বলছে, ভূমিকম্পে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া ভেনেজুয়েলাকে পুরোপুরি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে ও পুনর্গঠন করতে প্রায় ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল ফান্ডের প্রয়োজন হতে পারে।