
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় কৌশলগত প্রদেশ বেলুচিস্তান আবারও এক রক্তক্ষয়ী ও ভয়াবহ সহিংসতার উপকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর ওপর উপর্যুপরি হামলা, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অপহরণের পর হত্যা এবং রাষ্ট্রের পাল্টা সাঁড়াশি অভিযানে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এই চরম উত্তেজনার মাঝেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি নাটকীয় দাবি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে—বেলুচিস্তান নাকি পাকিস্তান থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এবং প্রদেশটির সিংহভাগ এলাকা এখন সশস্ত্র বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে!
ডন, জিও নিউজ, আল জাজিরা, রয়টার্স ও এএফপির মতো বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বেলুচিস্তানের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত সঙ্গিন। কয়েক দশক ধরে চলা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাত এখন আরও সুসংগঠিত, মারাত্মক ও বিস্তৃত রূপ পরিগ্রহ করেছে। তবে বাস্তবতার নিরিখে ‘বেলুচিস্তান পাকিস্তান থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে’ কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি’ (বিএলএ) প্রদেশটির ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত কোনো প্রমাণ মেলেনি।
কেন হঠাৎ এতটা উত্তপ্ত বেলুচিস্তান?
চলতি জুলাই মাসের শুরু থেকেই বেলুচিস্তানে বড় ধরনের কয়েকটি সমন্বিত হামলার পর পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পাকিস্তানের সামরিক সূত্রের দাবি, গত ৬ জুলাই থেকে পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে তিনটি বড় মাপের হামলায় অন্তত ৪২ জন পুলিশ ও সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে জিয়ারাত অঞ্চলের মাঙ্গি বাঁধের কাছে একটি পুলিশ পোস্টে অতর্কিত হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে অপহরণ করা হয়; পরবর্তীতে অপহৃত ১৮ জন পুলিশ কর্মকর্তার বুলেটবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পৃথক আরেকটি সশস্ত্র সংঘর্ষে প্রাণ হারান ১১ সেনাসদস্য।
এই ঘটনার পরপরই পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, ফ্রন্টিয়ার কোর ও পুলিশ যৌথভাবে বেলুচিস্তানের উপত্যকা ও দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে সর্বাত্মক যৌথ অভিযান শুরু করে। রাষ্ট্রীয় এই অভিযানের পর পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমদ শরিফ চৌধুরী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন:
‘আমরা তোমাদের ধাওয়া করব, আমরা তোমাদের আঘাত করব।’
তাঁর এই কঠোর বিবৃতিতে স্পষ্ট যে, ইসলামাবাদ বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল সাধারণ আইনশৃঙ্খলার অবনতি হিসেবে দেখছে না, বরং একে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করছে।
‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ ও ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ: গুঞ্জন বনাম বাস্তবতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি কথিত বিবৃতিতে দাবি করা হচ্ছে, বিএলএ বেলুচিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করেছে এবং প্রদেশের ৮৫ শতাংশ এলাকা এখন তাদের কব্জায়। তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই দাবিকে ‘তথ্যের অতিরঞ্জন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের জন্য কোনো মহাসড়ক অবরোধ করলে কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরকারি স্থাপনায় সাময়িক অনুপ্রবেশ করলেই তাকে স্থায়ী ভূখণ্ডের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বলা যায় না।
এখানে তিনটি মূল বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি:
১. পুরোনো লক্ষ্য: বিএলএ ১৯৪৮ সাল থেকেই কালাত রাজ্যের পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তিকে ‘অবৈধ দখলদারিত্ব’ আখ্যা দিয়ে স্বাধীন বেলুচিস্তান প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র লড়াই করে আসছে। ফলে তাদের প্রচারণায় ‘স্বাধীনতা’ বা ‘মুক্তি’ শব্দগুলোর ব্যবহার নতুন কিছু নয়।
২. স্বীকৃতির অভাব: ২০২৫ সালেও প্রবাসী বেশ কয়েকজন বেলুচ নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’ এর ডাক দিয়েছিলেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এর কোনো প্রশাসনিক ভিত্তি বা কূটনৈতিক স্বীকৃতি নেই।
৩. রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ: কোয়েটাসহ বেলুচিস্তানের সমস্ত বড় শহর, বিমানবন্দর, বিচারব্যবস্থা ও প্রাদেশিক সরকার এখনও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক প্রশাসনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বিএলএ আসলে কী চায় এবং কেন সংঘাত তীব্র হচ্ছে?
পাকিস্তান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত বিএলএ-এর মূল অসন্তোষ মূলত অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক বঞ্চনাকে কেন্দ্র করে। বেলুচিস্তান পাকিস্তানের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৪ শতাংশ হলেও এখানে দেশের মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ মানুষ বাস করে। এই প্রদেশটি প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, তামা ও সোনার মতো খনিজ সম্পদে বিপুল সমৃদ্ধ। এছাড়া আরব সাগরের তীরে অবস্থিত গভীর সমুদ্রবন্দর ‘গদর’ এখানেই অবস্থিত, যা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপেক)-এর মূল কেন্দ্রবিন্দু।
বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, তাদের মাটির সম্পদ দিয়ে পাকিস্তানের অন্য প্রদেশগুলো উন্নত করা হচ্ছে, অথচ স্থানীয় জনগণ মৌলিক অধিকার ও উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। উপরন্তু, সিপেক প্রকল্পের নিরাপত্তার নামে সেখানে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। এর জবাবে পাকিস্তান সরকারের দাবি, তারা বেলুচিস্তানের সড়ক, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে রেকর্ড বিনিয়োগ করেছে এবং বিদেশি শক্তির মদদে কিছু গোষ্ঠী এই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে।
তবে এবারের বিদ্রোহের ধরন আগের চেয়ে আলাদা। একসময় এই আন্দোলন পাহাড়ি উপজাতীয় নেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, এখন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণ ও শহুরে নারীরাও এতে শামিল হচ্ছেন। বিশেষ করে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিএলএ কর্তৃক ঘোষিত ‘অপারেশন হেরোফ ২.০’-এর অধীনে পরিচালিত আত্মঘাতী ও সমন্বিত হামলাগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ বিশ্বমঞ্চে আলোড়ন তৈরি করেছে।
মানবাধিকার সংকট ও চীনের সম্পৃক্ততা
বেলুচিস্তান সংকটের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক হলো ‘গুম’ বা জোরপূর্বক নিখোঁজের অভিযোগ। বেলুচ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, গত দুই দশকে বহু ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মীকে নিরাপত্তা বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে। এই ইস্যুতে ‘বেলুচ ইয়াকজেহতি কমিটি’ (বিওয়াইসি) এবং এর নেত্রী মাহরাং বেলুচ দেশজুড়ে এক বিশাল অহিংস ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। যদিও রাষ্ট্রপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে বিএলএ-কে মদদ দেওয়ার পাল্টা অভিযোগ এনেছে।
অন্যপক্ষে, চীনের বিপুল বিনিয়োগ ও চীনা প্রকৌশলীদের ওপর বিএলএ-এর উপর্যুপরি হামলা ইসলামাবাদের ওপর বড় ধরনের আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। বেইজিংয়ের বিনিয়োগকে রক্ষায় পাকিস্তানকে এখন বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করতে হচ্ছে।
পাকিস্তান কি ভেঙে যাচ্ছে?
সার্বিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বলা যায়, পাকিস্তান এখনই ভেঙে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ দেশটির সেনাবাহিনী এখনও সমস্ত কৌশলগত পরিকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। তবে ইসলামাবাদকে একই সাথে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে টিটিপি (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান)-এর হামলা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। পাকিস্তান এই সংকটের জন্য বরাবরই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এবং আফগানিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহারকে দায়ী করে আসছে, যদিও নয়াদিল্লি ও কাবুল এই অভিযোগ বরাবরই প্রত্যাখ্যান করেছে।
পরিশেষে বলা যায়, বেলুচিস্তানের এই সংকট কেবল একটি সামরিক সমস্যা নয়, এটি কয়েক দশকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। শুধু বন্দুকের নল দিয়ে এই অসন্তোষ পুরোপুরি দমন করা যে সম্ভব নয়, তা গত আট দশকের ইতিহাস প্রমাণ করেছে। পাকিস্তান যদি দ্রুত বেলুচ জনগণের রাজনৈতিক অধিকার, গুমের অবসান এবং সম্পদের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে বেলুচিস্তান এখনই স্বাধীন না হলেও এই অন্তহীন সহিংসতার চক্র পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে এক দীর্ঘস্থায়ী ও কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়ে রাখবে।