
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে সৌদি আরবের চালানো সাম্প্রতিক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও নজিরবিহীন বিমান হামলার পেছনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নীতিগত সমর্থন ও সবুজ সংকেত ছিল। এই সামরিক অ্যাকশনে যাওয়ার আগেই সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ওয়াশিংটনকে পুরো পরিকল্পনাটি বিস্তারিতভাবে অবহিত করেন এবং খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এই বিশেষ অনুমোদন আদায় করে নেন।
আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সোমবার সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদির ভয়াবহ বিমান হামলা এবং এর পাল্টা জবাবে সৌদি আরবের অভ্যন্তরে হুথিদের চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ছিল ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় ধরনের আন্তঃসীমান্ত সামরিক সংঘাত। এই তীব্র উত্তেজনার ফলে দুই পক্ষের মধ্যে গত চার বছর ধরে চলা অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে তা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চলমান সংঘাতকে আরও উসকে দেবে। এই বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা মাথায় রেখেই রিয়াদ মূলত আগেভাগে ওয়াশিংটনকে পাশে রেখে তাদের সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করে নিয়েছে।
ফাঁস হওয়া নথিপত্র ও তথ্যে জানা গেছে, গত সপ্তাহে সৌদি আরব হুথিদের আগ্রাসী তৎপরতা নিয়ে তাদের গভীর উদ্বেগের কথা ওয়াশিংটনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় এবং সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের জন্য মার্কিন সমর্থন দাবি করে। এরই ধারাবাহিকতায় ওয়াশিংটনে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত প্রথমে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-র সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। পরবর্তীতে রুবিও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে বিস্তারিত আলাপ করেন।
এরপর গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সরাসরি একটি ফোনালাপ সম্পন্ন হয়। সেখানে যুবরাজ ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে ট্রাম্পের সমর্থন চাইলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাতে পূর্ণ সায় দেন। তবে হোয়াইট হাউস এই স্পর্শকাতর বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে, ইরানের সমালোচনা করা ট্রাম্পের একটি পূর্ববর্তী সাক্ষাৎকারকে সূত্র হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এই নতুন করে যুদ্ধাবস্থা তৈরির মূল সূত্রপাত ঘটেছিল মূলত ১০ দিন আগে। তখন ইরানের ‘মাহান এয়ার’-এর একটি বিশেষ বিমান হুথি নিয়ন্ত্রিত সানা বিমানবন্দরে নাটকীয়ভাবে অবতরণ করে। বিমানটি ইয়েমেনের হুথি নেতাদের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলকে নিয়ে ইরানের সাবেক শীর্ষ নেতা আলী খামেনির জানাজায় অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে তেহরানে গিয়েছিল।
উল্লেখ্য, বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরান থেকে সানায় সরাসরি কোনো ফ্লাইট চলাচল করত না। কারণ সৌদি আরব সবসময় আশঙ্কা করত যে, এই আকাশপথ ব্যবহার করে হুথিদের কাছে ইরানি সামরিক উপদেষ্টা বা আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র পাচার করা হতে পারে। মার্কিন গোয়েন্দাদের মতে, মাহান এয়ার মূলত ইরানের আইআরজিসি (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস) দ্বারা পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ বিমানসংস্থা।
হুথিদের দাবি অনুযায়ী, সৌদি যুদ্ধবিমানগুলো প্রথমে ওই ইরানি বিমানটিকে সানায় নামতে বাধা দিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে হুথিরা উল্টো সৌদির বিমানবন্দরগুলোতে হামলার হুমকি দেয়। পরবর্তীতে গত সোমবার ওই ইরানি বিমানটি যখন হুথি প্রতিনিধি দল নিয়ে তেহরান থেকে ইয়েমেনে ফিরছিল, ঠিক তখনই সৌদি বিমানবাহিনী সানা বিমানবন্দরে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে রানওয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। ফলে বিমানটি বাধ্য হয়ে লোহিত সাগর উপকূলের হোদেইদাহ বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, ওই বিশেষ বিমানে হুথিদের জন্য অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল ছিল। এই রানওয়ে ধ্বংসের ঘটনার পরই ক্ষুব্ধ হুথিরা সৌদির আভা বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে এবং সৌদির জন্য নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।