
দীর্ঘ চার বছর ধরে বজায় থাকা আপেক্ষিক শান্তির অবসান ঘটিয়ে আবারও রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সংবেদনশীল অঞ্চল। ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি গোষ্ঠী সৌদি আরবের অভ্যন্তরে সরাসরি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যার ফলে দুই পক্ষের মধ্যে চার বছর ধরে চলা দীর্ঘ যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে গেছে।
নিজেদের নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানঘাঁটিতে রিয়াদের পক্ষ থেকে বোমাবর্ষণের অভিযোগ তুলে হুথিরা এই পাল্টা সামরিক আঘাত হানে। অন্য দিকে, সৌদি আরব দাবি করেছে যে তাদের আকাশসীমা লক্ষ্য করে ছোঁড়া হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তারা মাঝ আকাশেই সফলভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে।
ইয়েমেনে সক্রিয় সৌদি নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক সামরিক জোটের মুখপাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) জানিয়েছেন যে, সন্ত্রাসী হুথি মিলিশিয়াদের দ্বারা দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকা লক্ষ্য করে উৎক্ষেপণ করা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তাদের শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত সফলতার সাথে ভূপাতিত করেছে।
তবে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এই হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, তারা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় পার্বত্য সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত আভা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে নিশানা করে এই নিখুঁত ও সফল হামলা চালিয়েছেন। উল্লেখ্য, বিগত ২০২২ সালের মার্চ মাসে দুই বিবদমান পক্ষের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সৌদি আরবের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে হুথিদের এটিই প্রথম বড় ধরনের হামলা।
সানা বিমানবন্দরে হামলার জেরে সংঘাতের সূত্রপাত
এর আগে উত্তর ইয়েমেনের শাসনভার নিয়ন্ত্রণকারী হুথি গোষ্ঠী অভিযোগ উত্থাপন করেছিল যে, সৌদি আরব তাদের সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আকস্মিক বিমান হামলা চালিয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাসের চলমান প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি নস্যাৎ হয়ে গেছে।
হুথিরা রিয়াদের এই পদক্ষেপকে ‘নগ্ন আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এর কঠিন প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়। একই সাথে সানা বিমানবন্দরের ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত সৌদি আরবের আকাশসীমা ব্যবহারের বিষয়ে সব আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাকে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দেয় তারা। তবে নাটকীয় মোড় নিয়ে রিয়াদের মদদপুষ্ট ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সানা বিমানবন্দরের রানওয়েতে হামলার দায় নিজেদের কাঁধে নিয়েছে।
ইয়েমেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে জানিয়েছে যে, দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করে একটি ইরানি বিমানকে সানায় অবতরণ করা থেকে বিরত রাখতেই তারা ওই রানওয়েতে বোমা হামলা চালিয়েছে। তারা কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে যে, যেকোনো শত্রুভাবাপন্ন বিমান দেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করলে সমস্ত উপায়ে তার জবাব দেওয়া হবে এবং এর জন্য ইরান দায়ী থাকবে। পরবর্তীতে ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনীর একজন মুখপাত্র নিশ্চিত করেন যে, ওই বিতর্কিত ইরানি বিমানটি হুথিদের কড়া নিয়ন্ত্রণে থাকা লোহিত সাগর উপকূলের হোদেইদাহ বিমানবন্দরে শেষ পর্যন্ত সফলভাবে অবতরণ করেছে।
রেড ক্রসের বিমান নিয়ে জটিলতা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট
এই নতুন করে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাতের জেরে ইয়েমেনের সানা বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির একটি উড়োজাহাজ হুথিরা জোরপূর্বক আটকে রেখেছে বলে ইয়েমেনের একজন মন্ত্রী অভিযোগ করেছেন। তবে এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে রেড ক্রসের মুখপাত্র হাশেম ওসেইরান রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন যে, বিমানের কর্মী ও সংস্থার সকল কর্মকর্তা সম্পূর্ণ নিরাপদ আছেন।
ইয়েমেনে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর প্রক্সি ওয়ার বা ছায়াযুদ্ধের কারণে সেখানে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, হুথিদের এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা সৌদি আরবের লোহিত সাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানি রুটকে আবারও বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স