
যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাশীন দল লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক বিশাল ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের মেকারফিল্ড আসনের উপনির্বাচনে রেকর্ড ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের প্রভাবশালী মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম। রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে খোদ দলের ভেতরের অনেকেই এই ফলাফলকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের জন্য এক চূড়ান্ত ও মারাত্মক ধাক্কা হিসেবে বিবেচনা করছেন।
আজ শুক্রবার (১৯ জুন) ভোরের দিকে ঘোষিত আনুষ্ঠানিক ফলাফলে দেখা যায়, ‘কিং অব দ্য নর্থ’ খ্যাত এই নেতা ৫৪.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। অন্যদিকে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নাইজেল ফারাজের দল ‘রিফর্ম ইউকে’র প্রার্থী পেয়েছেন ৩৪.৫ শতাংশ ভোট। এই দাপুটে বিজয়ের পর লেবার পার্টির ভেতর স্টারমারকে সরিয়ে নেতৃত্ব পরিবর্তনের যে সুপ্ত আলোচনা চলছিল, তা এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে এবং বার্নহাম সেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে চলে এসেছেন।
ঐতিহাসিক এই জয়ের পর নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে অ্যান্ডি বার্নহাম বলেন: "এই ফলাফল যুক্তরাজ্যের রাজনীতির জন্য মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত হতে পারে।"
একই সাথে নিজের দলের নীতিনির্ধারকদের কড়া বার্তা দিয়ে তিনি আরও বলেন: "এটাই দিক বদলের শেষ সুযোগ। আমাদের এটা শুনতে হবে এবং সঠিকভাবে কাজ করতে হবে। আর কোনো সুযোগ পাওয়া যাবে না।"
বর্তমানে ৫৬ বছর বয়সী অ্যান্ডি বার্নহামকে লেবার পার্টির অন্যতম জনপ্রিয় মুখ হিসেবে গণ্য করা হয়। বিভিন্ন জনমত জরিপেও তিনি প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে আছেন। রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, দলের সাধারণ সদস্যদের ভোটে যদি এখন কোনো নেতৃত্ব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে বার্নহাম অনায়াসেই বিজয়ী হবেন।
কিয়ার স্টারমারের জনপ্রিয়তায় ধস ও দলীয় কোন্দল
জাতীয় নির্বাচনে বিশাল জয়ের মাত্র দুই বছর পেরোতেই প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের জনপ্রিয়তা এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। একের পর এক কেলেঙ্কারি, নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন এবং সিদ্ধান্তহীনতার অভিযোগে তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির চরম ভরাডুবির পর দলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সংসদ সদস্য (এমপি) ইতিমধ্যেই স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, তার নেতৃত্বের ওপর অনাস্থা এনে প্রতিরক্ষা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মতো সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছেন।
তবে চতুর্মুখী এই চাপের মুখেও প্রধানমন্ত্রী স্টারমার এখনো নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, কেউ তাকে চ্যালেঞ্জ করলে তিনি মাঠ ছাড়বেন না, বরং লড়াই করবেন। কিন্তু লেবার পার্টির অধিকাংশ এমপির মতেই, মেকারফিল্ডে বার্নহামের এই চোখ ধাঁধানো বিজয়ের পর স্টারমারের বিদায় এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
লেবার পার্টির দলীয় নিয়ম অনুযায়ী, বর্তমান নেতার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ জানাতে হলে পার্লামেন্টারি পার্টির নূন্যতম ২০ শতাংশ অর্থাৎ ৮১ জন এমপির লিখিত সমর্থনের প্রয়োজন হয়। এদিকে অ্যান্ডি বার্নহামও ঘরে বসে নেই, তিনি ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন যে নেতৃত্ব নির্বাচন হলে তিনি সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
কেন এই উপনির্বাচন ঐতিহাসিক?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৬৩ সালের পর থেকে যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে এটিই কোনো একক আসনের উপনির্বাচন, যা জাতীয় রাজনীতিতে এত গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। যদি সত্যি সত্যি বার্নহামের হাত ধরে নেতৃত্ব বদল হয়, তবে যুক্তরাজ্যে গত এক দশকের মধ্যে এটি হবে সপ্তম প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তন; যা গত দুই শতাব্দীর ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকার বদলের রেকর্ড গড়বে।
অ্যান্ডি বার্নহাম তার নির্বাচনী প্রচারণায় নিজেকে প্রায় ছায়া-প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই তুলে ধরেছিলেন। তিনি একদিকে যেমন দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ঠিক তেমনি উগ্র নব্য উদারনৈতিক অর্থনৈতিক নীতির কড়া সমালোচনা করতেও ছাড়েননি।
অবশ্য এই নাটকীয় জয়ের পরও দেশটির মুদ্রা পাউন্ডের বাজারে তেমন কোনো ওঠানামা দেখা যায়নি। কারণ, অর্থবাজারের বিনিয়োগকারীরা আগে থেকেই এই ফলাফলের ব্যাপারে স্পষ্ট আভাস পেয়েছিলেন।
বার্নহামের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মী ও বর্তমান সংস্কৃতিমন্ত্রী লিসা নন্দী আশা প্রকাশ করে বলেছেন যে, উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে বার্নহাম ও স্টারমার খুব দ্রুতই একসঙ্গে আলোচনায় বসবেন। অপরদিকে, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংও স্টারমারের ওপর পদত্যাগের চাপ বাড়াতে পুরোপুরি প্রস্তুত বলে রাজনৈতিক মহলে আভাস দিয়েছেন। সব মিলিয়ে, লেবার পার্টির অন্দরমহলে এখন এক চরম রাজনৈতিক নাটকের দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স