
দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও যুদ্ধ পরিস্থিতির চিরতরে অবসান ঘটাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে।
আগামী রোববার (১৪ জুন) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এই যুগান্তকারী চুক্তিটি সম্পাদিত হতে পারে বলে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। বিষয়টি সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে অবগত তিনটি পৃথক আন্তর্জাতিক সূত্র মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
প্রস্তাবিত এই সমঝোতা চুক্তিকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নজিরবিহীন গতিশীলতার সৃষ্টি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়ে জানান যে, ইরানের সঙ্গে চলমান দীর্ঘ সংঘাতের স্থায়ী নিরসনে একটি বড় ধরনের দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তা আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও প্রকাশ করেছেন যে, ইউরোপের মাটিতে অনুষ্ঠিতব্য এই সম্ভাব্য চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। উল্লেখ্য, আগামী সপ্তাহে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জি-৭ (G7) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ মার্কিন উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল ইউরোপে অবস্থান করবেন।
অবশ্য বহুল প্রতীক্ষিত এই চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে এখন পর্যন্ত ইরানের সরকারি মহলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা বা বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সূত্রগুলো আভাস দিচ্ছে, চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাব্য ভেন্যু বা স্থান হিসেবে সুইজারল্যান্ডের জেনেভাকেই সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রাখা হচ্ছে, যদিও বিকল্প হিসেবে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার নামও জোরালোভাবে বিবেচনায় রয়েছে।
একাধিক কূটনৈতিক সূত্র মারফত জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকটির নামকরণ করা হতে পারে ‘ইসলামাবাদ ঘোষণা’। মার্কিন-ইরান বৈরিতা দূর করে টেবিল টকে ফিরিয়ে আনার পেছনে মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তানের যে অনন্য ভূমিকা ছিল, মূলত তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিতেই এই নামকরণের বিষয়টি চূড়ান্ত বিবেচনায় আনা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও যোগ করেছে, এই সমঝোতা স্মারকটি হবে দুই দেশের মধ্যকার সুদীর্ঘ কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় ধাপের একটি আনুষ্ঠানিক সূচনা। যার ওপর ভিত্তি করে আগামীতে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি করা, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে বহুপাক্ষিক আলোচনার পথ সুগম হবে।
এই খসড়া চুক্তির ভেতরের বিষয়বস্তু সম্পর্কে ইরানের একজন শীর্ষস্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, খসড়া চুক্তিতে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন তেলের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, বিশ্বজুড়ে আটকে থাকা ইরানি আর্থিক সম্পদ অবমুক্ত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আঞ্চলিক ফ্রন্টে চলমান সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে আনার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
অন্যদিকে, পশ্চিমা কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পক্ষ থেকে এই সমঝোতা দলিলে সম্ভাব্য স্বাক্ষরকারী হিসেবে অংশ নিতে পারেন আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
তবে ভূ-রাজনীতির সংবেদনশীলতার কারণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই অত্যন্ত সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেছেন যে, আলোচনার চূড়ান্ত শব্দচয়ন ও ভাষা এখনও শতভাগ নির্ধারিত হয়নি। তবে আগামী শনিবারের মধ্যেই খসড়া দলিলে থাকা শেষ মুহূর্তের জটিলতাগুলো দূর করে তা চূড়ান্ত করার একটি বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।