
পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার নগর প্রশাসনে এক বড়সড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে গেছে। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে সাত বছর সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব সামলানোর পর কলকাতার মেয়রের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন প্রবীণ রাজনীতিক ফিরহাদ হাকিম। গতকাল শুক্রবার (৫ জুন) কলকাতা পৌর করপোরেশন ভবনে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি নিজের এই নাটকীয় সিদ্ধান্তের কথা জানান।
২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর কলকাতা পৌর করপোরেশনের মেয়রের আসন অলংকৃত করেছিলেন ফিরহাদ হাকিম। দীর্ঘ এই কর্মমেয়াদে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাকেই তিনি সবসময় প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তবে এত বছর পর হঠাৎ পদত্যাগের কারণ স্পষ্ট করতে গিয়ে তিনি জানান, বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে তিনি আগের মতো স্বাধীন ও কার্যকরভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করতে পারছিলেন না। যে প্রশাসনিক স্বাধীনতা ও ক্ষমতার কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে তিনি কাজ করে অভ্যস্ত ছিলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় তা আর বজায় নেই বলেই তিনি মনে করেন।
মেয়রের মর্যাদাপূর্ণ পদের ঐতিহ্য ও নিজের দায়িত্ব ছাড়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ফিরহাদ হাকিম আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘কেন আমি ইস্তফা দিচ্ছি? তার কারণ হল ফিরহাদ হাকিম কেউ না। কিন্তু যে চেয়ারটায় আমাদের সেই সব স্মরণীয় ব্যক্তিরা বসেছিলেন, সেই চেয়ারটার একটা আলাদা সম্মান আছে। আমি নিজে যখন মেয়র ছিলাম, দাপটের সঙ্গে চালিয়েছি। নিজেই পৌরমন্ত্রী, নিজেই মেয়র। পৌরসভায় যেটা অনুমোদিত সেটাই মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন করিয়ে নিয়ে এসে কাজ করা। যে সব মানুষরা আসতেন, তাদের সঙ্গে সঙ্গে সমস্যার সমাধান করা। এই কাজটা করতাম।’
বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেন, ‘তাই সেই চেয়ারটাকে আমি অবমাননা করতে পারি না। চেয়ারটার সম্মানহানি করতে পারি না। চেয়ার ধরে বসে রইলাম, ঢাল নেই, তরোয়াল নেই, নিধিরাম সর্দার। সেই মানুষগুলো, যারা হয়তো আমার থেকেও দাপটে ওই মেয়রের চেয়ার চালিয়ে গিয়েছেন, তাদের প্রতি অসম্মান হবে। তাই আমি ঠিক করেছি যে আমি আজ ইস্তফা দিচ্ছি। চেয়ারের সম্মানহানি করতে পারি না। চেয়ার ধরে বসে থাকলাম অথচ ঢাল নেই, তরোয়াল নেই নিধিরাম সর্দারের মতো অবস্থা। তাই আমি আজ ইস্তফা দিচ্ছি।’
সংবাদ সম্মেলনে বিদায়ী মেয়র জানান, এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি দলের শীর্ষ মহলের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে সবুজ সংকেত ও সম্মতি মেলার পরই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্তফাপত্র জমা দিয়েছেন। তাঁকে কলকাতার মেয়রের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য তিনি নিজের দল ও দলীয় নেতৃত্বের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
অতীতের কর্মদিবসগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ফিরহাদ হাকিম উল্লেখ করেন, বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনা মহামারির চরম সংকটের দিনগুলোতে কলকাতা পৌর করপোরেশনকে অবিশ্বাস্য সব কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সেই বিপজ্জনক সময়েও কলকাতার নাগরিকদের জরুরি সেবাগুলো অবিরাম সচল রাখা ছিল তাঁর প্রশাসনের জন্য অন্যতম এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
মেয়র পদের পাট চুকিয়ে কলকাতার আগামী নগর প্রশাসনের প্রতি অগ্রিম শুভকামনা জানিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যারা কলকাতা পৌর করপোরেশন পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন, তারা আরও বেশি যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে এই ঐতিহাসিক শহরকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। সেই সঙ্গে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর বিশেষভাবে জোর দেন তিনি।
উল্লেখ্য, কলকাতার তৃণমূল স্তরের রাজনীতি থেকে উঠে আসা ফিরহাদ হাকিম বিগত ২০০০, ২০০৫ এবং ২০১০ সালে কলকাতা পৌরসভার ৮২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে পর পর কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় পরবর্তীতে তিনি মেয়রের আসন লাভ করেন এবং এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কলকাতার মূল নগর প্রশাসনের অন্যতম শীর্ষ চালিকাশক্তি হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন।