
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এখন আর শুধু মানুষের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, সেখানে অত্যাধুনিক রোবট আর চালকবিহীন অস্ত্রের দাপট চলছে। সম্মুখসারির রক্তক্ষয়ী লড়াই থেকে অনেক দূরে নিরাপদ আশ্রয়ে বসে কমান্ডাররা এখন ড্রোনের লাইভ ফুটেজ দেখে হামলা চালাচ্ছেন।
রোববার (৩১ মে) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। সম্প্রতি পূর্ব ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনে একটি অভিযানে কোনো মানুষের উপস্থিতি ছাড়াই ড্রোন নজরদারি ও রোবটের নির্দিষ্ট গতিপথ ব্যবহারের মাধ্যমে তিনটি রুশ অবস্থান লক্ষ্য করে ছয়টি বড় বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। জনবলের তীব্র সংকট আর পশ্চিমা সাহায্যের অনিশ্চয়তার কারণে ইউক্রেন বাধ্য হয়েই চালকবিহীন প্রযুক্তির ওপর বেশি নির্ভর করতে শুরু করেছে, যা তাদের রাশিয়ার বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে সুবিধা দিচ্ছে।
চালকবিহীন অভিযানের সাফল্য ও প্রাণহানি হ্রাস
গত এপ্রিলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ইউক্রেনীয় বাহিনী প্রথমবারের মতো শুধু রোবট ও ড্রোন ব্যবহার করে রাশিয়ার একটি ঘাঁটি দখল করতে সক্ষম হয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তাদের চালকবিহীন ব্যবস্থাগুলো প্রায় ২২ হাজার সফল মিশন সম্পন্ন করেছে।
ইউক্রেনীয় সূত্রমতে, যুদ্ধক্ষেত্রে ধরা পড়া রুশ সেনারা এই বিস্ফোরকবাহী রোবটগুলোর নাম দিয়েছে—'নীরব মৃত্যু'। এগুলো এতটাই চুপচাপ চলে যে, রুশ সেনারা সাধারণত ১০ মিটারের মধ্যে চলে আসার আগে টেরই পায় না এবং ততক্ষণে তারা বিস্ফোরণের আওতায় চলে যায়। ইউক্রেনের থার্ড অ্যাসল্ট ব্রিগেডের 'এনসি১৩' ইউনিটের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৬৪টি অভিযানে এই রোবটগুলো যে ক্ষয়ক্ষতি করেছে, সেই একই কাজ করতে তাদের অন্তত ২,৩০০ জন সেনা লাগত। সাধারণ হামলায় এ ধরনের অভিযানে ইউনিটের অর্ধেক সেনা হতাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে এই রোবটগুলো অন্তত এক হাজার ইউক্রেনীয় সেনার প্রাণ বাঁচিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে যোদ্ধাদের অনুভূতি
যারা আগে ডনবাসের সম্মুখসারিতে লড়াই করেছেন, তাদের কাছে এই পরিবর্তনটা অবিশ্বাস্য মনে হয়। থার্ড অ্যাসল্ট ব্রিগেডের ডেপুটি কমান্ডার বার বলেন যে, আগে কখনো এমন কিছু কল্পনাও করেননি; তবে এখন বুঝতে পারছেন, তখন যদি এই ধরনের সরঞ্জাম থাকত, তাহলে তাঁর আরও অনেক সহযোদ্ধা বেঁচে যেত।
অন্যদিকে ইউনিট কমান্ডার মাইকোলা 'মাকার' জিনকেভিচের কাছে নতুন যুদ্ধটা কিছুটা ফাঁকা লাগে। তিনি বলেন, আগের যুদ্ধ ছিল আরও পুরুষালি, যেখানে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা আর শৃঙ্খলাই মূল বিষয় ছিল। এখন প্রযুক্তিই সব ঠিক করে দিচ্ছে এবং এখানে পেছনে ফেরার আর উপায় নেই। এটি এখন শুধুই প্রতিযোগিতা যে কে কত দ্রুত এই নতুন যুদ্ধের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।
কৌশলগত লক্ষ্য ও রোবটের কার্যকারিতা
চার বছরের যুদ্ধে ইউক্রেনের ছোট জনসংখ্যা অনেক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হওয়ায় দেশটি বাধ্য হয়েই এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন করেছে। ড্রোন ও রোবটের সঠিক ব্যবহার রাশিয়ার ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা প্রতি মাসে গড়ে ৩৫ হাজার রুশ সেনাকে হতাহত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন। যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ-এর সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধে রাশিয়ার মোট সামরিক মৃত্যু ইতিমধ্যে প্রায় ৫ লাখে পৌঁছেছে।
এখন রোবটগুলো পদাতিক বাহিনীর মৌলিক কাজও সম্পন্ন করছে। একটি ইউক্রেনীয় ইউনিট জাল দিয়ে ঢাকা ছাউনির নিচে ব্রাউনিং মেশিনগান বসানো রোবট ব্যবহার করছে। এতে একাধিক ক্যামেরা লাগানো রয়েছে, যা চারপাশের দৃশ্য স্পষ্ট দেখায়। খাওয়া-দাওয়া বা ক্লান্তির কোনো ব্যাপার না থাকায় এই রোবট দিনের পর দিন গাছের আড়ালে অপেক্ষা করতে পারে এবং শুধু গুলি ফুরিয়ে গেলে ফিরে আসে। একজন ইউক্রেনীয় সেনা জানান, যখন তারা শত্রুর বিরুদ্ধে এটি ব্যবহার করেছিলেন, তখন রুশ সেনারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল এবং মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছিল, কারণ তারা বুঝতেই পারছিল না কী করবে। সামগ্রিকভাবে, যুদ্ধক্ষেত্র এখন যন্ত্র আর মানুষের মিশ্রণে এক নতুন রূপ নিয়েছে যা ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সংজ্ঞাই বদলে দিচ্ছে।