
কানাডায় আত্মহত্যায় সহায়তার উদ্দেশ্যে অনলাইনে বিষাক্ত রাসায়নিক বিক্রির অভিযোগে দায়ের হওয়া ১৪টি মামলায় ৬০ বছর বয়সী কেনেথ ল নিজের দোষ স্বীকার করেছেন। শুক্রবার অন্টারিওর একটি আদালতে সরকারি কৌঁসুলিদের সঙ্গে হওয়া আইনি সমঝোতার ভিত্তিতে তিনি এই অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। এই সমঝোতার অংশ হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা আরও গুরুতর হত্যার অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক শেফ কেনেথ ল অনলাইন আত্মহত্যা-সংক্রান্ত বিভিন্ন ফোরামে পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে প্রায় ১,২০০টি বিষাক্ত রাসায়নিকের প্যাকেট বিক্রি করেছিলেন। এসব প্যাকেট বিশ্বের ৪০টি দেশে পাঠানো হয়, যার মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ গন্তব্য ছিল যুক্তরাজ্যে। কেনেথ ল যেসব অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছেন, সেসব মামলার ভুক্তভোগীরা সবাই কানাডার নাগরিক বলে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
যুক্তরাজ্যে কেনেথ ল-এর বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় দেশটির ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন কৌঁসুলিরা কেনেথ ল-এর বিরুদ্ধে ৭৯ জন ব্রিটিশ নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আনুষ্ঠানিক কোনো মামলা দায়ের করেননি। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট মৃত্যুগুলোর সঙ্গে কেনেথ ল-এর সরবরাহ করা পণ্যের সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে কানাডায় তাঁর বিরুদ্ধে দায় স্বীকার করা মামলাগুলোর একজন ভুক্তভোগী ছিলেন ১৯ বছর বয়সী তরুণ অ্যাশটিন প্রোসার ব্লেক। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে অন্টারিওতে তিনি আত্মহত্যা করেন। অ্যাশটিনের মা কিম প্রোসারের বক্তব্য অনুযায়ী, অ্যাশটিন খুবই হাসিখুশি ও কোমল স্বভাবের মানুষ ছিলেন। কোভিড-১৯ মহামারির পর তাঁর মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তিনি টরন্টোর একটি কলেজে এক বছর পড়াশোনা করার পর তা বন্ধ করে দিয়ে বাড়ি ফিরে যান। তিনি মানসিকভাবে অস্থিরতার মধ্যে ছিলেন এবং পরে আত্মহত্যা করেন। মা কিম প্রোসার বলেন, ‘কাউকে কারাগারে পাঠালেই যে আমার ছেলেকে হারানোর কষ্ট কমে যাবে, তা নয়।’
কেনেথ ল-কে ২০২৩ সালের মে মাসে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে মোট ১১টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা যৌথভাবে তদন্ত করেছে। এই তদন্ত প্রক্রিয়ায় যুক্তরাজ্য, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রায় এক ডজন দেশের তদন্তকারীরা সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। কেনেথকে গ্রেপ্তারের এক সপ্তাহ আগে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস’ এ-সংক্রান্ত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেখানে অভিযোগ করা হয় যে, কেনেথ ল তরুণদের কাছে বিষ বিক্রি করছেন।
ওই প্রতিবেদনের জন্য একজন সাংবাদিক ছদ্মবেশে ক্রেতা সেজে কেনেথের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ল ওই সাংবাদিককে তাঁর বিক্রি করা পণ্য কীভাবে ব্যবহার করলে ‘মৃত্যু নিশ্চিত করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি’—সে সম্পর্কেও সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছিলেন। ২০২৩ সালে কানাডার গোয়েন্দারা বিবিসিকে জানান, কেনেথ ল একাধিক ওয়েবসাইট পরিচালনা করতেন, যেখানে আত্মহত্যা করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য বিভিন্ন সরঞ্জাম ও রাসায়নিক পদার্থ বিক্রি করা হতো।
কানাডার ফৌজদারি আইন অনুযায়ী, আত্মহত্যায় সহায়তার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এই মামলায় কেনেথ ল-এর সাজা নির্ধারণের শুনানি আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর শুরু হবে এবং তা কয়েক দিন ধরে চলবে বলে জানা গেছে।