
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি সামরিক হামলার কারণে দেশটির ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন লেবাননের সংস্কৃতিমন্ত্রী ঘাসান সালামে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন শহর টায়ারের ধ্বংসাবশেষের খুব কাছেই বোমা হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া নাবাতিয়াহ শহরের ওপর অবস্থিত মধ্যযুগীয় বোফোর্ট ক্যাসল দুর্গেও সরাসরি আঘাত হানা হয়েছে। চলমান এই হামলার কারণে লেবাননের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো এখন মারাত্মক হুমকির মধ্যে রয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনার আড়ালে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনী ব্যাপক আকারে হামলা চালাচ্ছে। সীমান্তে স্থল অভিযানের পাশাপাশি রাজধানী বৈরুতসহ বিভিন্ন স্থানে নির্বিচার বোমাবর্ষণ করা হচ্ছে। লেবানন সীমান্তে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইসরায়েলের এই আগ্রাসন থামেনি। বুধবার (২৮ মে) বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলির শউইফাত এলাকায় বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী, যা গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বৈরুতের কাছাকাছি প্রথম হামলা। ইসরায়েলের দাবি, তারা ইরান ও হিজবুল্লাহপন্থি মিলিশিয়া জোট ‘ইমাম হুসেন ডিভিশন’-এর ক্ষেপণাস্ত্র শাখার প্রধান আলী আল-হুসাইনিকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছে। তবে এই বিষয়ে হিজবুল্লাহ বা ইরানের পক্ষ থেকে এখনও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
হামলার পাশাপাশি লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে উচ্ছেদ অভিযানও চালানো হচ্ছে। নতুন করে বেশ কয়েকটি এলাকার বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী, যার ফলে গৃহহারা মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কোনো কারণ ছাড়া বেসামরিক নাগরিকদের ওপর এই ইসরায়েলি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ। অন্যদিকে, সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ড্রোন শক্তির মুখে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বেশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। একের পর এক সশস্ত্র ড্রোনের আঘাত ঠেকাতে তেল আবিবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ হচ্ছে। দক্ষিণ লেবানন ও উত্তর ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর ড্রোনের আঘাতে নিয়মিত ইসরায়েলি সেনারা হতাহত হচ্ছেন এবং সর্বশেষ আরও এক সেনার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে ইসরায়েল কর্তৃপক্ষ। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ড্রোন হামলা থামাতে না পেরে মরিয়া হয়ে নির্বিচারে ও অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করছে ইসরায়েল।
এরই মধ্যে জাতিসংঘ জানিয়েছে যে, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে ঘোষিত ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর থাকা সত্ত্বেও গত এক সপ্তাহে লেবাননে অন্তত ১৫ শিশু নিহত এবং ৬২ শিশু আহত হয়েছে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ এই সংখ্যাকে ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেছে এবং জোর দিয়ে বলেছে যে, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী সংঘাতের সময় সব পরিস্থিতিতেই শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
জেনেভায় এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ইউনিসেফের মুখপাত্র রিকার্ডো পিরেস জানান, লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী শুধু গত এক সপ্তাহেই ৭৭ শিশু নিহত বা আহত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ১১ শিশু হতাহত হচ্ছে, যাদের অধিকাংশই দক্ষিণ লেবাননে বিমান হামলার শিকার হয়েছে। এমনকি শুধু গতকালই ৭ শিশু নিহত এবং ৩০ শিশু আহত হয়েছে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, চলমান হামলা ও সংঘাতের কারণে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে শিশুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে।