
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে টানা উত্তেজনা, হুমকি আর সামরিক চাপের রাজনীতির মধ্যে এবার যুদ্ধ থামাতে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নতুন প্রস্তাব খতিয়ে দেখছে ইরান। কয়েক দফা সংঘাত, পাল্টাপাল্টি হুমকি এবং তেলবাহী জাহাজ চলাচল ঘিরে অস্থিরতার পর এমন আলোচনার খবর সামনে আসতেই নতুন করে কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে ওয়াশিংটন, তেহরান ও তেলআভিভে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউস মনে করছে, ইরানের সঙ্গে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে। যদিও তেহরানের ভেতর থেকেই এই প্রস্তাবকে কেউ কেউ ‘আকাঙ্ক্ষার তালিকা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তবু ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রস্তাবটি এখনো পর্যালোচনায় রয়েছে এবং নিজেদের অবস্থান পাকিস্তানের মাধ্যমে জানানো হবে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতি কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই কড়া ভাষায় বলেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন আলোচনার টেবিলে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। তার ভাষায়, ‘ইরান ট্রিগারে আঙুল রেখেই অপেক্ষা করছে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রয়োজনীয় ছাড় না দিলে তেহরানের জবাব হবে কঠোর।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সমান আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় দুই পক্ষের মধ্যে ‘খুব ভালো আলোচনা’ হয়েছে এবং একটি চুক্তি সম্ভব। তবে একইসঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান প্রস্তাবে রাজি না হলে আগের চেয়েও ভয়াবহ বোমা হামলা শুরু হতে পারে।
জানা গেছে, আলোচনায় থাকা প্রস্তাবে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। তবে এসব শর্ত বাস্তবায়ন পুরোপুরি নির্ভর করছে চূড়ান্ত সমঝোতার ওপর।
এদিকে পারস্য উপসাগরে আটকে পড়া জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে যুক্তরাষ্ট্র যে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ অভিযান শুরু করেছিল, সেটি শুরুর এক দিনের মাথায় স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের পরও ইরান আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না দিলেও দেশটির রেভুলেশনারি গার্ড ইঙ্গিত দিয়েছে, ‘আগ্রাসন’ বন্ধ হলে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হতে পারে।
ইসরায়েলও পুরো পরিস্থিতিতে সরাসরি অবস্থান নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তাদের ‘পূর্ণ সমন্বয়’ রয়েছে। তার দাবি, মূল লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির আড়ালে এখনো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে চলছে ভয়ংকর শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা। একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার বার্তা, অন্যদিকে প্রকাশ্য যুদ্ধের হুমকি পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলছে। তেল, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সামরিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে যে সংঘাত তৈরি হয়েছে, তার স্থায়ী সমাধান এখনো অনেক দূরের পথ বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।