ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আবারও জ্বালানি তেলের দাম তীব্রভাবে বেড়েছে। দেশটির বাজারে সাধারণ মানের গ্যাসোলিনের দাম যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় ৫২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন ‘এএএ’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার (৬ মে) যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন রেগুলার গ্যাসোলিনের গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫৪ ডলারে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে গ্যালনপ্রতি দাম বেড়েছে ৩১ সেন্ট।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হরমুজ প্রণালী ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ওই অঞ্চলে ট্যাংকার চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং ইরান কার্যত প্রণালীটির প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণে রাখায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
এর আগে এপ্রিলের মাঝামাঝি সংঘাত কিছুটা কমার ইঙ্গিত পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে টানা দুই সপ্তাহ জ্বালানি তেলের দাম কমছিল। তখন বাজারে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল।
জ্বালানি বিশ্লেষক রব স্মিথ বলেন, প্রাথমিক যুদ্ধবিরতির বার্তা বাজারে স্বস্তি এনেছিল। এতে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা কমে এবং খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। তবে পরবর্তীতে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ায় সেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বিশ্বজুড়ে জ্বালানির চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে দাম আরও বাড়বে। তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালী যতদিন পুরোপুরি স্বাভাবিক না হবে, ততদিন বিশ্ববাজারে তেলের ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দামের বড় অংশই নির্ভর করে অপরিশোধিত তেলের মূল্যের ওপর। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের মোট খরচের প্রায় অর্ধেকের বেশি আসে অপরিশোধিত তেলের দাম থেকে।
বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেকেই ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী জ্বালানি সংকটের সঙ্গে তুলনা করছেন। সে সময়ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের দাম ৫ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে, হরমুজ প্রণালীতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় তেল সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে গত এপ্রিলের শুরুতে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১২ ডলার পর্যন্ত ওঠে।
তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা এগোনোর আভাসে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে। বুধবার তা ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে খুচরা বাজারেও দাম কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে দাম বাড়ার আরেকটি বড় কারণ ছিল ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ। গত এপ্রিলে ইরানের সমুদ্রবন্দর ঘিরে কড়াকড়ি আরোপের পর বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমে যায় এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দামে।
রাইস ইউনিভার্সিটির জ্বালানি গবেষক জিম ক্রেন বলেন, ইরান বিশ্ববাজারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল সরবরাহ করছিল। কিন্তু রপ্তানিতে বাধা আসায় বাজারে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে এবং দাম দ্রুত বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান হলেও বাজার স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। কারণ এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ও বীমা খরচে অতিরিক্ত ঝুঁকি যোগ হয়েছে, যা ভবিষ্যতেও তেলের দামের ওপর প্রভাব ফেলবে।
তারা আরও বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজে তেল উৎপাদনে এগিয়ে থাকলেও দেশটির অধিকাংশ শোধনাগার ভারী ধরনের অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের উপযোগী। অথচ দেশীয় খনিতে উৎপাদিত তেলের বড় অংশ হালকা ধরনের হওয়ায় বিদেশি তেলের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কাটানো সম্ভব হচ্ছে না।