
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনা নিরসনে তড়িঘড়ি করে একটি ‘ভাসা-ভাসা’ চুক্তি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় মিত্ররা।
রোববার (১৯ এপ্রিল) রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জার্মানির অভিজ্ঞ কূটনীতিকরা মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুত কূটনৈতিক সাফল্য দেখাতে গিয়ে জটিল কারিগরি বিষয়গুলো পাশ কাটিয়ে একটি অপরিপূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে।
তাদের মতে, এ ধরনের অসম্পূর্ণ সমঝোতা দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান না করে বরং নতুন করে প্রযুক্তিগত জটিলতা ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি করবে। ইউরোপীয় কর্মকর্তারা জানান, ২০০৩ সাল থেকে তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছেন, কিন্তু বর্তমানে ওয়াশিংটন তাদের দুই দশকের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করা ফেডেরিকা মোঘেরিনি সতর্ক করে বলেন, এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে ১২ বছর সময় ও ব্যাপক কারিগরি পরিশ্রম লেগেছিল; তাই কয়েক ঘণ্টায় একই ধরনের চুক্তি সম্ভব নয়।
বর্তমানে ইসলামাবাদে চলমান আলোচনায় ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সম্পূর্ণ ধ্বংস করুক বা অন্য কোনো দেশে সরিয়ে নিক। তবে এটি তুরস্কে নাকি ফ্রান্সে পাঠানো হবে—তা নিয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের দাবি, তাদের ওপর থেকে সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা স্থায়ীভাবে তুলে নিতে হবে এবং ভবিষ্যতে কোনো হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
আলোচনায় জড়িত সূত্রগুলোর মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান আলোচক স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের রিয়েল এস্টেট খাতের অভিজ্ঞতা দিয়ে এ ধরনের জটিল কূটনৈতিক ইস্যু সমাধান করা কঠিন। এক ইউরোপীয় কূটনীতিক বলেন, “আমেরিকানরা ভাবছে পাঁচ পৃষ্ঠার একটি নথিতে তিন-চারটি পয়েন্টে একমত হওয়া মানেই সব শেষ, কিন্তু পরমাণু ইস্যুর প্রতিটি ধারা ডজনখানেক নতুন বিবাদের জন্ম দেয়।”
তবে এই সমালোচনা নাকচ করে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভালো চুক্তি করতে পারদর্শী এবং তিনি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেবেন। তা সত্ত্বেও ইউরোপীয়দের আশঙ্কা, যদি আইএইএ’র পূর্ণাঙ্গ প্রবেশাধিকার ও কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ নিশ্চিত না হয়, তবে এমন চুক্তি টেকসই হবে না।
এদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ সহ্য করার সক্ষমতা দেখিয়েছে, যা তাদের দরকষাকষির অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। তেহরানের প্রধান দাবি হলো একটি অ-আগ্রাসন চুক্তি বা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা।
অন্যদিকে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো চাইছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও এই আলোচনার অন্তর্ভুক্ত হোক। তবে ইরান তাদের এই সক্ষমতাকে জাতীয় নিরাপত্তার অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখে এবং এ বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, একটি দ্রুত চুক্তি হলেও পরবর্তী ধাপে অসংখ্য কারিগরি জটিলতা সামনে এসে তা আবারও ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স