
মধ্যপ্রাচ্যে সদ্য ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগেই তা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। লেবাননে ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলা এই সমঝোতার ভিত নড়িয়ে দিয়েছে, কারণ যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবানন থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লেবাননের বিভিন্ন স্থানে একযোগে হামলা চালায় ইসরায়েল। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে শতাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ঘটনায় কয়েক শতাধিক মানুষের মৃত্যু ও সহস্রাধিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ধ্বংসস্তূপের চিত্র তৈরি হয়েছে, হাসপাতালগুলোতে তৈরি হয়েছে চরম চাপ। একটি গণমাধ্যমকে একজন চিকিৎসক নেতা বলেন, ‘সব ধরনের চিকিৎসকদের দ্রুত হাসপাতালে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাতে হচ্ছে, পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।’
এই হামলার সময়কালই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। কারণ, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতিতে ‘সব ফ্রন্টে’ সংঘাত বন্ধের কথা বলা হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলছে, এই সমঝোতা কেবল ওয়াশিংটন, তেহরান ও তেলআবিবের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্ব স্পষ্ট করে জানিয়েছে, লেবাননের সংঘাত একটি ‘আলাদা পরিস্থিতি’।
অন্যদিকে ইরান শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, লেবানন এই যুদ্ধবিরতির অংশ। তাদের মতে, লেবাননে হামলা চলতে থাকলে সেটি কার্যত যুদ্ধবিরতির চেতনাকে ভঙ্গ করছে। একটি গণমাধ্যমকে এক ইরানি কর্মকর্তা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে ঠিক করতে হবে তারা যুদ্ধবিরতি চায়, নাকি ইসরায়েলের মাধ্যমে সংঘাত চালিয়ে যেতে চায়।’
এই মতপার্থক্যই এখন পুরো সমঝোতাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। কারণ লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইরানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং আঞ্চলিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্লেষকদের মতে, যদি যুদ্ধবিরতির সময় হিজবুল্লাহর ওপর হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে ইরান দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একদিকে তাদের আঞ্চলিক প্রভাব দুর্বল হবে, অন্যদিকে মিত্রদের কাছে তাদের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
এই প্রেক্ষাপটে আন্দ্রেস ক্রেইগ একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘লেবাননই এই যুদ্ধবিরতির সবচেয়ে দুর্বল জায়গা।’ তার মতে, এখানে চাপ বাড়লে ইরান প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হতে পারে এবং এতে পুরো সমঝোতাই ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই পরিস্থিতি উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে লেবাননে হামলাকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা’ হিসেবে উল্লেখ করে যুদ্ধবিরতির আওতায় দেশটিকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, লেবাননে চলমান সামরিক তৎপরতা পুরো যুদ্ধবিরতিকে ‘গুরুতর ঝুঁকির’ মধ্যে ফেলছে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর যে স্বস্তির আশা তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। সামনে ইসলামাবাদে আলোচনার টেবিলে বসার কথা থাকলেও, লেবানন ইস্যুতে এই টানাপোড়েন মিটবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।