
ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই ইরানকে ঘিরে নতুন সংঘাতে জড়িয়ে ৭৬ বছরের পুরোনো সামরিক জোট ন্যাটো এখন কঠিন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ, সমালোচনা ও বিতর্কিত অবস্থানের কারণে জোটটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক সংকট পার করে টিকে থাকলেও এবার ইরান যুদ্ধ ন্যাটোর জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ইউরোপ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে সংঘটিত এই যুদ্ধে জোটটির ভূমিকা নিয়ে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার পর ট্রাম্প ইউরোপীয় দেশগুলোকে হরমুজ প্রণালি সুরক্ষায় যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানান। কিন্তু এতে সাড়া না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি এবং জোট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও তোলেন।
বিশ্লেষক ও কূটনীতিকদের মতে, শীতল যুদ্ধের সময় গড়ে ওঠা এই জোট, যা দীর্ঘদিন ইউরোপীয় নিরাপত্তার মূল ভরসা ছিল, এখন দুর্বলতার মুখে পড়েছে। এমনকি এর প্রতিরক্ষা কাঠামো ভবিষ্যতে টিকে থাকবে কি না— তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ইউরোপ, রাশিয়া ও ইউরেশিয়া প্রোগ্রামের প্রধান ম্যাক্স বার্গম্যান বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ন্যাটো এখন সবচেয়ে সংকটপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। অন্যদিকে, গত ফেব্রুয়ারিতে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুতে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ইউরোপের আত্মরক্ষার ধারণাকে “হাস্যকর চিন্তা” বলে উল্লেখ করেছিলেন।
ফ্রান্সের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ফ্রাঁসোয়া লেকোয়ান্ত্রে বলেন, ‘ন্যাটো এখনও প্রয়োজনীয়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ন্যাটোর কথা ভাবার সক্ষমতা আমাদের থাকতে হবে। ন্যাটোর সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ফ্রেন্ডস অব ইউরোপ থিঙ্ক ট্যাঙ্কের সিনিয়র ফেলো জেমি শেয়া বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করেন। এদিকে, হরমুজ ইস্যুতে ন্যাটোর অনাগ্রহ নিয়ে ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের হতাশা স্পষ্ট হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, ন্যাটো কোনো একতরফা নীতি অনুসরণ করতে পারে না।
আগামী সপ্তাহে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুতে ওয়াশিংটন সফরে যাচ্ছেন, যেখানে ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করা হবে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষা প্রশ্নে ইউরোপীয় দেশগুলো এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল।
ইউরোপের ওপর যুদ্ধের প্রভাব চাপিয়ে দিচ্ছেন ট্রাম্প
সিএনএন জানিয়েছে, ইউরোপ ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী ছিল না, তবুও ট্রাম্প সেই যুদ্ধের প্রভাব ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। যুদ্ধ শুরুর সময় ইরানের জনগণের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমাদের কাজ শেষ হলে, তোমাদের সরকার দখল করে নিও। এটা তোমাদেরই হবে।’ তবে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে, এবং এখন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই জ্বালানি সংকটে পড়েছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস রিচার্ড হাস মনে করেন, দায় এড়াতে ট্রাম্পের এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে নতুন মার্কিন নীতির ইঙ্গিত বহন করে।
ট্রাম্পের অবস্থানের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে ইউরোপ
পলিটিকোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ন্যাটো মিত্রদের প্রতি ট্রাম্পের ক্ষোভ ইউরোপীয় দেশগুলোকে তার বিরুদ্ধে আরও কাছাকাছি এনে দিয়েছে। তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করছে— যুক্তরাষ্ট্র যদি জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিটেন, স্পেন, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের প্রতি ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ ন্যাটোর ভেতরে গভীর বিভাজনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাসমুসেন গ্লোবালের সিইও এবং ন্যাটোর সাবেক নীতি পরিকল্পনা পরিচালক ফ্যাব্রিস পোথিয়ের মনে করেন, ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইউরোপকে অবমূল্যায়ন করার ফল ভোগ করছেন ট্রাম্প। তার মতে, এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা।