
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের পরিচালিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছে মার্কিন কংগ্রেসে। একই সাথে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে যুদ্ধকালীন সহায়তার অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর বিচারের বিষয়টিও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুক্রবার (২১ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান এই প্রস্তাবটি উপস্থাপন করেন। ওহাইয়ো থেকে নির্বাচিত এই কংগ্রেসম্যান বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন।
প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে দমন-পীড়ন শুরু করে। এতে জামায়াতে ইসলামীর মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ উগ্র ইসলামপন্থি গোষ্ঠীগুলো তাদের সহযোগিতা করে।
এতে আরও বলা হয়েছে, নিহতের সঠিক সংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও নির্ভরযোগ্য হিসাব অনুযায়ী তা কয়েক লক্ষাধিক। পাশাপাশি দুই লাখের বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হন। সামাজিক লজ্জা ও কলঙ্কের কারণে প্রকৃত সংখ্যা কখনোই পুরোপুরি জানা সম্ভব হয়নি এবং বহু ভুক্তভোগীর ঘটনা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়নি।
ল্যান্ডসম্যান তার প্রস্তাবে ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডের পাঠানো ‘সুনির্দিষ্ট গণহত্যা’ শীর্ষক টেলিগ্রামের উল্লেখ করেন। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহায়তায় অবাঙালি মুসলমানরা পরিকল্পিতভাবে হামলা চালাচ্ছে এবং বাঙালি ও হিন্দুদের হত্যা করছে।’
এ ছাড়া ৬ এপ্রিল ১৯৭১-এ পাঠানো আরেকটি টেলিগ্রাম, যা ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিত, সেটিও প্রস্তাবে উদ্ধৃত হয়েছে। এতে ব্লাড যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নীরবতার সমালোচনা করে লিখেছিলেন যে, এখানে ‘গণহত্যা’ শব্দটি সম্পূর্ণভাবে প্রযোজ্য— বিশেষ করে হিন্দুদের পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার ক্ষেত্রে।
প্রস্তাব উপস্থাপনের সময় ল্যান্ডসম্যান বলেন, “জাতিসংঘের গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি সংক্রান্ত কনভেনশনে গৃহীত সংজ্ঞা অনুযায়ী পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ১৯৭১ সালের অভিযানও ‘গণহত্যা’।
মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণ, ভুক্তভোগীদের স্মরণ এবং ভবিষ্যতে এমন অপরাধ প্রতিরোধের জন্য এসব ঘটনা লিপিবদ্ধ করা ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন— “পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের ইসলামপন্থি মিত্ররা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালিদের নির্বিচারে হত্যা, রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীদের হত্যা এবং হাজার হাজার নারীকে ‘যৌনদাসী’তে পরিণত করলেও, তারা বিশেষভাবে হিন্দু সংখ্যালঘুদের গণহত্যা, ধর্ষণ, ধর্মান্তর ও জোরপূর্বক বিতাড়নের টার্গেট করেছিল।”
সবশেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ল্যান্ডসম্যান বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের মিত্র জামায়াতে ইসলামী যে অপরাধগুলো সংঘটিত করেছে, সেগুলোকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া নৈতিক দায়িত্ব।
উল্লেখ্য, গত ৯ ফেব্রুয়ারি ‘হিন্দু অ্যাকশন’ নামের একটি সংস্থার উদ্যোগে ক্যাপিটল হিলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন নিয়ে একটি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি এবং একাত্তরের গণহত্যার বিষয়টি আলোচিত হয়। ওই আলোচনার ধারাবাহিকতাতেই কংগ্রেসে নতুন এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান।