
বিশ্ব রাজনীতির চালচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে—এটি কোনো সাময়িক রূপান্তর নয়, বরং একটি বড় ধরনের ভাঙনের ইঙ্গিত। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা এমনই সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সম্মেলনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খাতের প্রভাবশালীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং বিশ্বজুড়ে নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার অবক্ষয়ের ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একই মঞ্চে আজ বুধবার ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের।
গত বছর রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর থেকেই কার্নি বলে আসছেন, বিশ্ব আর ট্রাম্প-পূর্ব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না। দাভোসের বক্তব্যে তিনি সরাসরি ট্রাম্পের নাম না নিলেও বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নেতৃত্বের প্রভাব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
কার্নির ভাষায়, ‘আমরা কোনো পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি না, বরং একটি গভীর ভাঙনের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছি।’
তিনি বলেন, কানাডা দীর্ঘদিন ধরে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সুফল পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই ব্যবস্থাই সমুদ্রপথ উন্মুক্ত রাখা, আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, সম্মিলিত নিরাপত্তা জোরদার এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে—যা কানাডার জন্য উপকারী ছিল।
তবে বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্ব বড় শক্তিগুলোর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। কার্নির মতে, ক্ষমতাধর দেশগুলো এখন নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় অর্থনৈতিক চাপ ও প্রভাব বিস্তারের কৌশল বেছে নিচ্ছে।
‘আলোচনার টেবিলে না থাকলে মেনুতে থাকবেন’
মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য সতর্কবার্তা দিয়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু নিয়ম মেনে চললেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে—এই ধারণা আর কার্যকর নয়।
তিনি বলেন, ‘মাঝারি শক্তির দেশগুলোকে মানিয়ে নিতেই হবে। প্রশ্ন হলো—আমরা কি শুধু নিজেদের চারপাশে দেয়াল তুলে টিকে থাকার চেষ্টা করব, নাকি ঐক্যবদ্ধ হয়ে বড় কোনো লক্ষ্য নিয়ে এগোব?’
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘আপনি যদি আলোচনার টেবিলে না থাকেন, তাহলে আপনি মেনুতে থাকবেন।’ বড় শক্তির দেশগুলোর বিশাল বাজার, সামরিক শক্তি ও চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা রয়েছে, যা মাঝারি দেশগুলোর ক্ষেত্রে নেই বলেও মন্তব্য করেন কার্নি।
কানাডা–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন উত্তাপ
কার্নির এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন কানাডা–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি কানাডার প্রভাবশালী দৈনিক গ্লোব অ্যান্ড মেইল জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আগ্রাসনের আশঙ্কায় কানাডার সেনাবাহিনী বিশেষ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে।
এদিকে ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে এমন মন্তব্য কমেছে, তবে গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা একটি মানচিত্রে কানাডা ও ভেনেজুয়েলাকে মার্কিন পতাকায় আবৃত দেখানো হয়েছে, যা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এ ছাড়া গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে ট্রাম্পের হুমকির প্রেক্ষাপটে এবারের দাভোস সম্মেলনেও বাড়তি উত্তেজনার আবহ তৈরি হয়েছে।