
গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে ডেনমার্কের একটি ‘মৌলিক মতবিরোধ’ রয়েছে বলে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন। বুধবার হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এ মন্তব্য করেন।
রাসমুসেন জানান, প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকটি ছিল খোলামেলা ও গঠনমূলক। তবে তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রশ্নে এখনো অনড় অবস্থানে রয়েছেন, যা ডেনমার্কের জন্য সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তিনি বলেন, বিষয়টি ডেনমার্কের স্বার্থের পরিপন্থী এবং এ অবস্থান তারা যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন।
বৈঠকের পর ট্রাম্প পুনরায় গ্রিনল্যান্ড দখলের আগ্রহ প্রকাশ করলে ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ে এবং ন্যাটোর ভেতরেও উত্তেজনা দেখা দেয়।
যদিও এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড কোনো বড় অগ্রগতিতে পৌঁছাতে পারেনি, তবে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে তিন পক্ষ একটি উচ্চপর্যায়ের যৌথ কর্মদল গঠনে একমত হয়েছে। রাসমুসেন জানান, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই কর্মদলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে এবং সমঝোতার পথ খোঁজা হবে।
তিনি আরও বলেন, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়েও আলোচনায় আগ্রহী। তার মতে, উচ্চ পর্যায়ের সংলাপ শুরু হওয়াটাই ইতিবাচক দিক।
তবে আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব মোকাবিলায় নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যে আংশিক সত্যতা রয়েছে বলে স্বীকার করেন রাসমুসেন। একই সঙ্গে তিনি গ্রিনল্যান্ডের আশপাশে রাশিয়া ও চীনের যুদ্ধজাহাজ নিয়মিত অবস্থানের দাবিকে সত্য নয় বলে উল্লেখ করেন।
কম জনসংখ্যার হলেও গ্রিনল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর আমেরিকা ও আর্কটিক অঞ্চলের মধ্যবর্তী অবস্থানের কারণে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং নৌযান নজরদারিতে দ্বীপটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড অপরিহার্য।
বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পিটুফিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের শতাধিক সামরিক সদস্য স্থায়ীভাবে অবস্থান করছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র এই ঘাঁটি পরিচালনা করে আসছে। ডেনমার্কের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সেখানে আরও সেনা মোতায়েন করতে পারে।
বৈঠক শেষে গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোৎজফেল্ট জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে তারা আগ্রহী হলেও দখল বা নিয়ন্ত্রণের যেকোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করবেন। তার ভাষায়, ‘আমরা আমাদের সীমা কোথায়, তা পরিষ্কার করে দিয়েছি।’
ভ্যান্স ও রুবিও বৈঠক শেষে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “জাতীয় নিরাপত্তার জন্য আমাদের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন।” তিনি আরও দাবি করেন, রাশিয়া বা চীন গ্রিনল্যান্ড দখল করতে চাইলে ডেনমার্ক তা ঠেকাতে পারবে না, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র পারবে।
এই ইস্যুর মধ্যেই ইউরোপের বিভিন্ন মিত্র দেশ গ্রিনল্যান্ডের প্রতি সমর্থন জানাতে শুরু করেছে। সুইডেন জানিয়েছে, ডেনমার্ক চাইলে তারা গ্রিনল্যান্ডে সশস্ত্র বাহিনী পাঠাতে প্রস্তুত। ফ্রান্স ঘোষণা দিয়েছে, আগামী মাসে গ্রিনল্যান্ডে একটি কনস্যুলেট খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। জার্মানি জানিয়েছে, সম্ভাব্য সামরিক সহায়তার পরিবেশ যাচাই করতে তারা একটি অনুসন্ধানী দল পাঠাবে।
ডেনমার্ক সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমেই এগোবে। বিবৃতিতে বলা হয়, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এখন আর্কটিক অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে এই আলোচনা ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক বৈদেশিক নীতির ধারাবাহিক অংশ। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়েছে এবং সিরিয়ায় আইএস লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করেছে। পাশাপাশি ইরানে চলমান বিক্ষোভ দমনে তেহরানের ভূমিকা নিয়ে সামরিক পদক্ষেপের হুমকিও দিয়েছেন ট্রাম্প।
এদিকে জরিপে দেখা গেছে, গ্রিনল্যান্ডের অধিকাংশ বাসিন্দা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে যেতে চান না। একই মনোভাব রয়েছে মার্কিন নাগরিকদের মধ্যেও। সাম্প্রতিক এক জরিপে মাত্র ১৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক গ্রিনল্যান্ড দখলের পক্ষে মত দিয়েছেন, আর প্রায় অর্ধেক এর বিরোধিতা করেছেন।
সূত্র: বিবিসি