
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বিক্ষোভকারীদের হত্যা ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের সতর্কবার্তার পরই এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে তেহরান প্রশাসন।
বুধবার ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “আমরা জানতে পেরেছি যে ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা বন্ধ হয়েছে এবং আটক কিংবা গ্রেপ্তার কারো মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনাও স্থগিত রেখেছে ইরান। আমরা নির্ভরযোগ্য কর্তৃপক্ষ থেকে এ তথ্যের নিশ্চয়তা পেয়েছি।”
এর আগের দিন মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইরানের আন্দোলনকারীদের রাজপথে আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। একই বার্তায় তিনি বিক্ষোভ দমনে নির্বিচারে গুলি চালানোর অভিযোগ তুলে বলেন, “ইরানে বিক্ষোভ দমন করতে নির্বিচারে গুলি চালানো হচ্ছে। এসব নির্বোধ হত্যা যতদিন না বন্ধ হয়, ততদিন পর্যন্ত ইরানের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে আমি বৈঠক করব না। (ইরানের বিক্ষোভকারীদের জন্য) সহযোগিতা আসছে। ইরানকে আবার মহান করে তুলুন (মিগা-মেইক ইরান গ্রেট এগেইন)।”
পরে ওই দিনই মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, ইরানে আন্দোলন শুরুর পর থেকে কতজন নিহত হয়েছেন— সে বিষয়ে এখনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পায়নি যুক্তরাষ্ট্র। তবে নিহতের সংখ্যা যে অত্যন্ত বেশি, সে বিষয়ে তিনি ও তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তারা অবগত বলে জানান।
উল্লেখ্য, গত দুই সপ্তাহ ধরে ইরানজুড়ে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে, যা প্রতিদিনই আরও তীব্র রূপ নিচ্ছে। এই আন্দোলনের সূচনা হয় দেশটির দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে। বছরের পর বছর অবমূল্যায়নের ফলে ইরানি রিয়েল বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রাগুলোর একটি। এখন এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়েলের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫।
মুদ্রার এই চরম দুরবস্থার কারণে ইরানে দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি চলছে। খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান ও চিকিৎসাসহ মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে সাধারণ মানুষ চরম সংকটে পড়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে গত ২৮ ডিসেম্বর মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা ধর্মঘটের ডাক দেন। সেখান থেকেই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়।
এরপর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সব শহর ও গ্রামে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দেশটির স্বাভাবিক কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
আন্দোলন দমনে ইরান সরকার ইতোমধ্যে ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করেছে। পাশাপাশি পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জনতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ১২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং হাজার হাজার বিক্ষোভকারী গ্রেপ্তার হয়েছেন।
গত বুধবার ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, আটক বিক্ষোভকারীদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করে ফাঁসি কার্যকর করা হবে। ওই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বন্ধ করা হয়েছে।
সূত্র: এএফপি