
ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) তেহরানের সামরিক কাঠামোর মূল আদর্শিক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। এই বাহিনী সরাসরি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কাছে জবাবদিহি করে। পশ্চিমা দেশগুলো আইআরজিসিকে বিক্ষোভ দমন ও রাজনৈতিক শাসন নিশ্চিত করার জন্য অভিযুক্ত করেছে।
আইআরজিসি কী এবং কারা এতে রয়েছেন
ইরানিয়ান স্টাডিজের আন্তর্জাতিক ইনস্টিটিউটের গবেষক ক্লেমেন্ত থার্ম বলেন, ফার্সি ভাষায় ‘পাসদারান’ নামে পরিচিত এই বাহিনী ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ প্রচার করা। বর্তমান এ বাহিনীতে আনুমানিক ১ লাখ ৫০ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার সদস্য রয়েছেন; তবে একটি সূত্রের মতে, এটি ২ লাখেরও বেশি হতে পারে।
আইআরজিসি একটি সশস্ত্র বাহিনী, যা স্থল, নৌ ও মহাকাশ সক্ষমতার সঙ্গে অভিজাত সামরিক শক্তির মতো কার্যক্রম পরিচালনা করে। নিয়মিত সেনাবাহিনীর তুলনায় তারা বেশি প্রশিক্ষিত, উন্নত সরঞ্জামসমৃদ্ধ এবং উচ্চ বেতনভুক্ত। এছাড়া ইরানের আঞ্চলিক মিত্র হিজবুল্লাহ ও ইরাকে ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মধ্যমণি হিসেবে কাজ করে।
গত বছরের জুনে মোহাম্মদ পাকপুরকে আইআরজিসির প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন খামেনি। তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের প্রথম দিনে নিহত হোসেইন সালামির স্থলাভিষিক্ত হন। পাকপুর ১৯৮০–৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধে অভিজ্ঞ যোদ্ধা।
অর্থনীতি ও সম্পদে প্রভাব
জ্যঁ-জোরেস ফাউন্ডেশনের গবেষক ডেভিড খালফা আইআরজিসিকে “একটি সাম্রাজ্যের ভেতরে আরেকটি সাম্রাজ্য” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ইরানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতে উদ্ভাবন, জ্বালানি, প্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ ও ব্যাংকিং—নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
খালফা উল্লেখ করেন, বাহিনীর বার্ষিক সামরিক বাজেট প্রায় ৬–৯ বিলিয়ন ডলার, যা ইরানের সামরিক বাজেটের প্রায় ৪০ শতাংশ। বাস্তবে তারা ইরানের অর্থনীতিতেও ব্যাপক প্রভাব রাখে।
কাজের পদ্ধতি ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক
আইআরজিসি একটি বিস্তৃত গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে, যা বিক্ষোভকারীদের দ্রুত শনাক্ত ও নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে সক্ষম। আধা-সামরিক বাহিনী বাসিজের ওপর তারা মূলত নির্ভরশীল; বাসিজের সদস্যদের নিয়োগ তরুণ ইরানিদের মধ্য থেকে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য অনুযায়ী, বাসিজের সদস্যসংখ্যা ৬–৯ লাখ হতে পারে।
বিক্ষোভ দমন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন
দেশে যেকোনো বিক্ষোভ দমনের ক্ষেত্রে আইআরজিসির ভূমিকা মূল। খালফা বলেন, বাহিনীটির নীতি ‘জিরো টলারেন্স’। ইরান হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, চলমান বিক্ষোভে অন্তত ৭৩৪ জন নিহত হয়েছেন। যদিও সরকারি সূত্র জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা ২ হাজারের বেশি।
আইআরজিসি দমন অভিযান চালানোর সময় সদস্যরা প্রায়শই বেসামরিক পোশাকে মাঠে উপস্থিত থাকেন, যাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনে তাদের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকারযোগ্য থাকে।
সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে। অস্ট্রেলিয়া ২০২৪ সালে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাসবাদের জন্য অভিযুক্ত করেছে। ইউরোপীয় কর্মকর্তারা ও ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্যরা আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। জার্মানি বিশেষভাবে কুদস ফোর্সকে এই তালিকাভুক্তির পক্ষে, যা ২০২১ সালে জার্মান সিনাগগে হামলার সঙ্গে জড়িত বলে মনে করা হয়।
আইআরজিসি ইরানের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে দখল করে রেখেছে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখছে।
সূত্র: এএফপি