
শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের সময়ের অপচয় কমানো এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষা ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সামঞ্জস্য ফেরাতে ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী বছরের ৭ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে এই পরীক্ষা।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি জানিয়েছে, ঘোষিত সূচি অনুযায়ীই ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। কোনোভাবেই পরীক্ষার সময় পেছানোর সুযোগ রাখা হয়নি।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘সরকার ঘোষিত নির্ধারিত সময়েই ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। এর আগেই নির্ধারিত সিলেবাস শেষ করে টেস্ট পরীক্ষা নিতে হবে। পরীক্ষার সময় পেছানোর কোনো সুযোগ নেই।’
সরকারের ২০২৬ সালের শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী, এসএসসির টেস্ট বা নির্বাচনী পরীক্ষা ২৮ অক্টোবর শুরু হয়ে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত চলার কথা। এর ফলাফল ১৮ নভেম্বরের মধ্যে প্রকাশ করতে হবে। ফলে টেস্ট পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর পাবলিক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শিক্ষার্থীরা প্রায় দুই মাস সময় পাবে।
তবে আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় কিছুটা কমে যাচ্ছে। সাধারণত টেস্ট বা নির্বাচনী পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শিক্ষার্থীরা আড়াই থেকে তিন মাস সময় পেয়ে থাকে।
ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রি-টেস্ট পরীক্ষা শেষ হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের আগেই পাঠ্যসূচি শেষ করে অক্টোবরের মাঝামাঝি টেস্ট পরীক্ষা আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এমন পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি শিক্ষাপঞ্জি অনুসরণ করে টেস্ট পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে অক্টোবরের শেষ ভাগ অথবা নভেম্বরের শুরুতে নির্বাচনী পরীক্ষা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে এসএসসি পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীরা দুই মাসেরও কম সময় প্রস্তুতির সুযোগ পেতে পারে।
প্রস্তুতির সময় কমে যাওয়ায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, টেস্ট পরীক্ষার পর সময় স্বল্পতার কারণে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পরীক্ষার ফলাফলেও পড়তে পারে।
তবে অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান মনে করেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাঠ্যসূচি শেষ করে টেস্ট পরীক্ষা আয়োজন করা হলে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে বড় কোনো সমস্যা হবে না।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সিলেবাস শেষ করেই টেস্ট পরীক্ষা নেওয়া হবে। এতে তারা প্রস্তুতি নিয়েই পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। তাই প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলব, তারা যেন নির্ধারিত সময়ে সিলেবাস শেষ করে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করে তোলে।’
রাজধানীর সেন্ট গ্রেগরী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ব্রাদার প্লাসিড পিটার রেবেইরো সিএসই জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে টেস্ট পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে এসএসসি পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবে বলে তিনি মনে করেন।
তবে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বলছেন, সব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পাঠ্যসূচি শেষ করা সম্ভব নাও হতে পারে। বিশেষ করে শহরের বাইরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক কম সময় পেলে প্রস্তুতিতে ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে এসএসসি পরীক্ষা ফেব্রুয়ারির শুরুতে এবং এইচএসসি পরীক্ষা এপ্রিলের শুরুতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। কিন্তু করোনা মহামারির পর থেকে ওই সময়সূচি আর বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয় ২১ এপ্রিল, আর এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয় ২ জুলাই।
অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, নানা কারণে প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন থেকে উল্লেখযোগ্য সময় হারিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে আগ্রহী শিক্ষার্থীরাও সেশনজটের কারণে সমস্যায় পড়ছেন।
তিনি বলেন, ‘বছরের পর বছর যদি আমাদের জীবন থেকে কর্মঘণ্টা হারিয়ে যায়, তাহলে সঠিক দিক খুঁজে পেতে আমাদের কষ্ট হবে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও দুর্যোগের কারণে কাজগুলো সময়মতো করতে পারি না। সব মিলিয়ে প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে এসএসসির ক্ষেত্রে চার-পাঁচ মাস, এইচএসসির ক্ষেত্রে ছয়-সাত মাস হারাচ্ছে। সেশন মিসের ফলে দীর্ঘ জীবনের অনেক সময় নষ্ট হচ্ছে, এটা অনাকাঙ্ক্ষিত।’
তার মতে, শিক্ষাবর্ষের কার্যক্রমকে নির্ধারিত সময়ের ধারায় ফিরিয়ে আনতে পরীক্ষার সূচিতেও ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতা ফেরাতে হবে। ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা জানুয়ারির শুরুতে আয়োজনের উদ্যোগকে সেই প্রক্রিয়ারই অংশ হিসেবে দেখছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি।